Note: Now you can download articles as PDF format
বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য 9564866684 এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন
  • Travel

অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রাম : চিল্কিগড়, ঝাড়গ্রাম, বেলপাহাড়ি

  • মীর হাকিমুল আলি
  • April 21, 2020
  • 199 বার পড়া হয়েছে
Download PDF

দিনটা ছিল মকরসংক্রান্তির দিন। সেই একদিনের ছুটিতে শীতকালীন অরণ্যের স্বাদ নিতে আমাদের বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক মিলে একটা স্করপিও রিজার্ভ করে গিয়েছিলাম চিল্কিগড়, ঝাড়গ্রাম আর বেলপাহাড়ি। তারই টুকরো টুকরো স্মৃতি জোড়া লাগিয়ে শুরু করছি আমার আর এক ভ্রমণ সিরিজ "অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রাম।"

মকরের দিন খুব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম মেদিনীপুর থেকে। চাঁদড়াতে সকালের ব্রেকফাস্ট সেরে ফেললাম। তারপর কাঁসাই নদীর ওপর ব্রিজে দাঁড়িয়ে নদীবক্ষের কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম। শীতের সকাল। ঠান্ডা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। চারদিকে হালকা কুয়াশার চাদরে মোড়া চারদিক। আমরা চললাম চিল্কিগড়ের উদ্দেশ্যে। কালো পিচের মসৃণ রাস্তা অসাধারণ সুন্দর। দুই ধারে জঙ্গল, বিশেষ করে শাল মহুয়ার। কোথাও অবারিত মাঠ। আর খেজুর-তাল গাছের ছড়াছড়ি। রাস্তা বড্ডো মনোরম। আর এরকম ফাঁকা রাস্তায় যেতে যেতে মনে হতেই পারে এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত তুমি বল তো? আসলে শেষ হয়তো হয় না। নিজেদের থেমে যেতে হয়, বেঁকে যেতে হয়, পথ ছেড়ে অন্য পথে যেতে হয়। যাই হোক, ঝাড়গ্রাম জেলা আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। ও হ্যাঁ, আমরা সবাই জানি জঙ্গলমহল এই ঝাড়গ্রাম এখন একটা নবগঠিত জেলা। এই ঝাড়গ্রাম সম্পর্কে কয়েকটা কথা না বললে কেমন ধারণাটা পরিষ্কার হয় না।

ঝাড়গ্রাম জেলা হল পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা। এটি পাহাড়, বনভূমির সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। জেলার উত্তরে কাকরাঝোড় বনাঞ্চল এবং দক্ষিণে সুবর্ণরেখা নদ। এটি বন্যপ্রাণীদের জন্য ভাল বাসস্থান এবং পর্যটকদের জন্য একটি প্রিয় গন্তব্য। প্রাচীন মন্দির, রাজপ্রাসাদ এবং লোকসুরগুলি এই এলাকাটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম মহকুমাটিকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাইশতম জেলা আত্মপ্রকাশ করে। ঝাড়গ্রাম জেলার জেলাসদর হল ঝাড়গ্রাম শহর। অতীতে একসময় এখানে যখন উপজাতিদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয় তখন সম্রাট আকবর সেই বিদ্রোহ দমন করার জন্য মানসিংহকে এখানে পাঠান। সালটা ছিল ১৫৯২। সর্বেশ্বর সিংহ ও তার বড়দাকে দায়িত্ব দেওয়া হল এখানকার বিদ্রোহীদের দমন করার। তখন সর্বেশ্বর সিংহ রাজপুতদের সাহায্য নিয়ে জঙ্গলে বিদ্রোহীদের দমনের কাজ করেন। পরবর্তীকালে এখানে একটি নতুন রাজ্য গঠিত হয়। তারপরে রাজপূতরা এই অঞ্চলকে দুটি ভাগে ভাগ করে। একটি ভাগের রাজধানী হয় ঝাড়গ্রাম ও অন্যটির রাজধানী হয় বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুর।

ছোটনাগপুর মালভূমি ক্রমশ ঢালু হয়ে মিশে গিয়েছে এবং ঠিক এই মিশে যাওয়া অঞ্চলটিতে গড়ে উঠেছে জঙ্গলময় ঝাড়গ্রাম। এখানকার মাটি ল্যাটেরাইট ধরনের। আবহাওয়া বেশ রুক্ষ ও শুষ্ক। গরমের দিনে অত্যন্ত গরম আর শীতের দিনে বেশ জাঁকিয়ে শীত পড়ে। বৃষ্টিপাতও বেশি হয়। ঝাড়গ্রাম উপজাতীয় নৃত্যের স্বর্ণ কোষাগার। এই উপজাতি নৃত্যের কিছু বিলুপ্তির পথে। চুয়াং, চ্যাং, চউ, ড্যাংগ্রে, ঝুমুর, পান্তা, রণপা, সাহারুল, টুসু ও ভাদু ইত্যাদি মানুষের সৃজনশীল শিল্পকর্মের এক একটি নিখুঁত অভিজ্ঞতা শুধু নয়, বরং একটি সভ্যতার প্রয়োজনীয় মাত্রার মাধ্যমে একটি আকর্ষণীয় সাহসিকতা, এর যৌথ অগ্রাধিকার, তাদের বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং দর্শন। উপজাতীয় সংস্কৃতির পাশাপাশি নিয়মিত বাঙালির উৎসব - দুর্গা পূজা, সরস্বতী পূজা এবং কালী পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া শীতলা, মনসা, দোলযাত্রা, রাসযাত্রা, জন্মাষ্টমি, ভীমপূজা, জগন্নাথের রথযাত্রা প্রভৃতি পূজায় সাথে অন্যান্য সাধারণ পূজাও সংঘটিত হয়। ঝাড়গ্রামে অনেক মেলা এবং শোভাযাত্রা স্থান পায়। ঝাড়গ্রামের বিখ্যাত মেলা হল জঙ্গলমহল উৎসব, ঝাড়গ্রাম মেলা ও যুব উৎসব, শ্রাবণী মেলা, বৈশাখী মেলা, মিলন মেলা।
 
 
 
আবার ফিরে আসি আমাদের গল্পে। বেলা ১১টা নাগাদ আমরা চিল্কিগড়ের ডুলুং নদীর তীরে পৌঁছে গেলাম। একটা জায়গায় গাড়ি পার্ক করে আমরা হাটতে লাগলাম। ততক্ষণে ঝলমলিয়ে রোদ উঠেছে। চিল্কিগড় জায়গাটা পাথরময়। কিছুটা হেঁটে যাওয়ার পরেই আমরা দেখতে পেলাম আঁকাবাঁকা সরু একখান নদী যার নাম ডুলুং। মহাশ্বেতা দেবীর গল্প পড়তে গিয়ে এই নদীর কথা পড়েছিলাম। আজ চোখের সম্মুখে সেই ডুলুং তার ক্ষীণ কলেবর নিয়ে বয়ে চলেছে। বয়ে চলেছে বললে ভুল বলা হবে। নদীতে এতটুকুও স্রোত নেই, ধীর স্থির। জল কিন্তু কাঁচের মতো স্বছ। আর খুবই শীতল। জল কমে গিয়ে নদীর বক্ষদেশের পাঁজর বেরিয়ে এসেছে। চারদিকে পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কোথাও একটু গর্ত বেশি হওয়ায় সেখানে জল বেশি। স্নান করা যাবে। বালি বেশ মোটা, বালির থেকে কাঁকর বেশি। বিভিন্ন ঋতুতে এই নদী রূপ বদল করে। বর্ষায় ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। দুকূল ছাপিয়ে বন্যাও সৃষ্টি করে কখনো কখনো। শীতে ক্ষীণ ধারা। আর গ্রীষ্মে একদম শুকনো কাঠ। শরতে দুই কুল কাশ ফুলে ভরে যায়। ঝাড়গ্রাম শহর থেকে ১৫ কিমি দূরে এই চিল্কিগড় আর ডুলুং নদী। নদীর তীরে প্রাচীন মন্দির আর জীববৈচিত্রে পরিপূর্ণ জঙ্গল। শীতকাল এই নদীর তীরে পিকনিক করতে যায় বহু মানুষ। ডুলুং নদী সুবর্ণরেখা নদীর একটা উপনদী। রোহিনীর কাছে সুবর্ণরেখার সাথে মিলিত হয়েছে। আমরা হালকা পা ডুবিয়ে বা পাথরে পাথরে পা দিয়ে নদী পেরিয়ে ওপারে কনকদূর্গা মন্দিরে গেলাম। পরের পর্বে সেই গল্প হবে। আজ এই পর্যন্ত।
 
 
 
বিশেষ অনুরোধ - ঝাড়গ্রাম এখন একটা বেশ আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। তাই অবশ্যই আসুন জঙ্গলসুন্দরী ঝাড়গ্রামে। ঝাড়গ্রাম, চিল্কিগড়, বেলপাহাড়ি আরো বহু জায়গা আছে ঘোরার। কিন্তু প্লাস্টিক-পলিথিন ফেলা থেকে বিরত থাকুন। সবুজ, সুন্দর রাখুন এই ঝাড়গ্রামকে।

 

পরিচিতি:

মীর হাকিমুল আলি পেশায় একজন গৃহশিক্ষক এবং একটি বিদ্যালয়ের আংশিক সময়ের শিক্ষক (ভূগোল)। বিভিন্ন জায়গা সম্পর্কে জানা, সেখানকার মানুষদের পোশাক, বাড়িঘর কেমন, ভাষা, উৎসব, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছোটো থেকেই তাই ভূগোল বিষয় নিয়ে পড়ার একটা আলাদা আগ্রহ তৈরী হয়l স্কুল জীবনে কাছাকাছি ঘুরতে গেলেও কলেজ এক্সকারসন থেকেই তার ভ্রমণ একটি নেশায় পরিণত হয়l তারপর একটু একটু করে তা বাড়তে থাকেl বর্তমানে তার বয়স ২৬ ইতিমধ্যে ভারতের কয়েকটা রাজ্যের কিয়দংশ ঘুরে ফেলেছেন তিনিl সেগুলি হলো পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল ইত্যাদিl তবে গোটা ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশ ঘোরার ইচ্ছা তার বরাবরেরl ঘোরার পাশাপাশি ছবি তুলতেও আগ্রহী লেখক।
শেয়ার করুনঃ