Note: Now you can download articles as PDF format
  • Travel

অরুনাচল প্রদেশ - উদীয়মান সূর্যের দেশ (পঞ্চম পর্ব)

  • সৌমী ঘোষ
  • June 28, 2020
  • 14 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


প্রথম পর্ব পড়ার জন্য  এখানে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

তৃতীয় পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

চতুর্থ পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

তাওয়াঙের সূর্যদয় দেখার ইচ্ছা ছিল প্রবল সেই যেদিন থেকে ঠিক হয়েছিল এবারের গন্তব্য অরুণাচল। কি করে যে বেড়াতে এলেই হঠাং করে আমি আর্লি রাইজার হয়ে উঠি সেটা এখনও রহস্যপূর্ণ।
ভোর ৫টায় উঠে বসে আছি, বাইরে সবে তখন আলোর রেখা দেখা দিচ্ছে। জানলার কাঁচ ভর্তি শিশিরের মধ্যে দিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা চলছে, কখন আসবেন তিনি। না তাকে দেখার জন্য কোনো ভিউ পয়েন্টে এ যাবার দরকার নেই, কম্বল মুড়ি দিয়ে হোটেলের ঘরের জানলার কাছটুকু আসলেই দর্শন পাওয়া যাবে। পাওয়া গেলও তাই, কিছুক্ষনের প্রতিক্ষা শেষে দূরের পাহাড়ের পিছন থেকে উদয় হলেন, সত্যি আজকে 'The Land Of Rising Sun' এ আসার যথাযথ অর্থ খুঁজে পেলাম। দেখতে দেখতে আমাদের পুরো ঘর ভাসিয়ে দিল রবির সেই কিরণ।

কিছু পরে সকলে তৈরী হয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেড়িয়ে পড়লাম তাওয়াং দর্শনে। হোমস্টে থেকে বেড়িয়ে গাড়িতে ৫ মিনিটের দুরত্বে পৌঁছে গেলাম ভারতের বৃহত্তম আর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মনেষ্ট্রীতে নাম "দি তাওয়াং মনেষ্ট্রী"। এই মনেষ্ট্রীর একটি তিবেতিয়ান ভালো নামও আছে- "Gaden Namgyal Lhatse" এর মানে হল "Celestial Paradise In A Clear Night"। ১৬৮০ সালে পঞ্চম দালাই লামা Ngawang Lobsang Gyatso র শুভেচ্ছায় Merak Lama Lodre Gyatso এই মনেষ্ট্রীটি তৈরী করেছিলেন। কথিত আছে সেই monk যখন এই মনেষ্ট্রীটি প্রতিষ্ঠার জন্য জায়গা খুঁজছিলেন তখন একটি ঘোড়া এসে নদীর পাশে এই ভ্যালির ওপর এই স্থানটি দেখিয়ে দিয়েছিল। তাই এই স্থানটির নাম তাওয়াং যার অর্থ- 'তা' মানে ঘোড়া আর 'ওয়াং' মানে নির্বাচন করা, এককথায় ঘোড়া দ্বারা নির্বাচন করা জায়গা। বিশাল এলাকা জুড়ে এটি বিস্তৃত, মনেষ্ট্রীর ভিতরেই বসবাস করেন প্রায় ৫০০ মঙ্ক। তাদের বিদ্যালয়, লাইব্রেরী, খাবার স্থান আরও কতকি সব এই মনেষ্ট্রীর গন্ডির মধ্যে। গেট দিয়ে ঢুকে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে তবে পৌঁছনো যাবে মূল মনেষ্ট্রীতে। ঢুকতেই দেখলাম সামনে বিশাল এক বুদ্ধ মূর্তি, এক স্নিগ্ধ চাহুনিতে আমাদের দিকে চেয়ে আছেন। তার সামনে কিছু কচিকাচা লামারা পাঠ নিচ্ছে তাদের গুরুর কাছ থেকে। মনেষ্ট্রীর পাশেই রয়েছে একটি মিউজিয়াম। বৌদ্ধ ধর্মীয় সামগ্রী, মুখোশ, প্রাচিন পুঁথি আরও অনেক কিছু রয়েছে সেখানে। দর্শন শেষে আমরা মনেষ্ট্রীর পিছন দিকের এক নিরিবিলি রাস্তা দিয়ে বেড়িয়ে চললাম পরবর্তী গন্তব্যে।


যাচ্ছি সেই বুদ্ধ মূর্তির পাদদেশে যাকে তাওয়াঙের যে কোনো প্রান্ত থেকেই দেখা যায়। তিনি যেন শীর্ষে বসে তাওয়াঙের ভালোমন্দ দেখে চলেছেন। মূর্তিটির ঠিক নীচেই আছে একটি প্রার্থনাগৃহ। পাশেই একটি দোকানে এখানকার traditional dress, tribal dress পরে ছবি তোলার ব্যাবস্থা আছে। এখানকার অনেক Tribes দের মধ্যে যার পোশাক ভালো লাগবে তাই পরে ছবি তোলা যাবে মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে।
ছবি টবি তুলে এবার আমরা চললাম তাওয়াং War Memorial দেখতে।  তে ভারত চিন যুদ্ধে আমাদের প্রায় ২৪২০ সৈন্য শহিদ হয়েছিলেন। তাদের প্রত্যেকের নাম, সঙ্গে রেজিমেন্টের নাম সম্মানের সাথে খোদাই করা আছে মেমোরিয়ালের দেওয়ালে। মেমোরিয়ালের ভিতরের ঘরে রয়েছে সেই সময়কার বিভিন্ন ছবি, এখানকার একটি বিশাল ম্যাপ, সৈন্যদের ব্যবহার করা বিভিন্ন জিনিসপত্র, বুলেটের আঘাতে ফুটো হয়ে যাওয়া হেলমেট আরও অনেক কিছু। বিপরিত দিকে আর একটি ঘরে রয়েছে সুবেদার যোগিন্দর সিংজির একটি মূর্তি। ১৯৬২ যুদ্ধে এ বুমলা পাসের কাছে তিনি তার কিছু সৈন্যদের নিয়ে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন চিনা সৈন্যদের সামনে। পায়ে গুলি লাগা সত্ত্বেও মনের জোড়ে আর দেশমাতার প্রতি ভালোবাসায় চিনাদের আক্রমণকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করেছিলেন। শহিদ সেই বীর সেনাকে পরমবীরচক্রে ভুষিত করা হয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা একটি লাইট & সাউন্ড সো এর মাধ্যমে সেই ঘটনাটি দর্শকের সামনে তুলে ধরা হয়।


এরপর আমরা চললাম Urgelling Gompa দেখতে যা ষষ্ঠ দালাই লামার জন্মস্থান। কথিত আছে ষষ্ঠ দালাই লামা যখন লাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবেন তার আগে তিনি তার একটি লাঠি মাটিতে গেঁথে রেখে দিয়ে গেছিলেন যা পরবর্তীকালে একটি বড় ওক গাছে পরিনত হয়ে যায়। এই জায়গাটি মূল শহড় থেকে একটু দুরে এবং খুবই শান্তিপূর্ণ। এখানে একটি প্রার্থনাগৃহ রয়েছে যেখানে হাতে আঁকা ষষ্ঠ দালাই লামার একটি ছবি রাখা আছে সঙ্গে আছে তার হাতের ছাপ। এই জায়গাটি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান।

এরপর আমরা চললাম তাওয়াং বাজারের উদ্দেশ্যে।
তাওয়াং বাজারে ঘুরছি এমন সময় কোথা থেকে কানে এল সেই পরিচিত শব্দ, কোথায় যেন ঢাক বাজছে। আর আমায় পায় কে, ঠিক শব্দ অনুসরণ করে এসে পৌঁছলাম একটি পূজা মন্ডপের সামনে। ভিতরে গিয়ে দেখি দশভূজার সামনে তখন ধুনুচি নাচ হচ্ছে। কলকাতা থেকে এতদূরে এসে বিজয়া দশমীর দিন দেবীর দর্শন পাওয়া কি চাড্ডিখানি ব্যাপার! বৌদ্ধদের স্থানে আস্ত একটি শিবমন্দির সঙ্গে কালিও রয়েছে। সেই মন্দিরের সামনেই মন্ডপে পূজা হচ্ছে।
ইতিমধ্যে বেলা অনেকটাই গড়িয়েছে তাই দুপুরের খাবারটা সারতে হবে। আপনি যদি বাঙালি হন আর তাওয়াঙের মত জায়গায় এসেও যদি সুস্বাদু বাঙালি খাবারের খোঁজ পেতে চান তাহলে আপনাদের জন্য অন্যতম একটি স্থান হল তাওয়াং বাজারে অবস্থিত মা কালি হোটেল। মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে সুস্বাদু নির্ভেজাল নিরামিষ থালি পাওয়া যায় এখানে।


আর আপনি যদি আমার মত পাবলিক হন মানে যেখানে যাবেন সেখানকার খাবার চেখে দেখার অভিপ্রায় রাখেন তাহলে আমার মত চলে আসতে পারেন আমাদের Come Inn হোমস্টেতে। তাদের লাঞ্চের সময় হঠাং করে উদয় হয়ে তাদের রান্না খাবার বায়না করলেও তারা একটুও রাগ করেন না। বরং খুশি হয়ে আমার জন্য বানিয়ে দিলেন chicken thukpa। এই আন্তরিকতা শহুড়ে মানুষদের মধ্যে পাওয়া খুবই দুর্লভ তাই তো বারবার ছুটে আসি এরকম কোনো পাহাড়ি পরিবেশে।
দেখতে দেখতে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল, মানে এখানে যেহেতু তাড়াতাড়ি সূর্যদয় হয় তাই নিমেষের মধ্যেই চারপাশ গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যায়। আর এই অন্ধকারকে ভেদ করেই এবার আমরা বেরোলাম তাওয়াং ওয়ার মেমোরিয়ালের light & sound show দেখতে। মাত্র 30 টাকা পার হেড টিকিট কেটে নির্দিষ্ট সময়ে ওয়ার মেমোরিয়ালের পিছন দিকের স্টেডিয়ামে ঢুকে পরলাম। show শুরু হয় 4.30-5.00টা থেকে চলে 6.30-7.00টা পর্যন্ত। মাত্র 30মিনিটের এই show। প্রতিদিনের এই পুরো অনুষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্বে আছেন আমাদের আর্মির দাদারা। আসনসংখ্যা নির্দিষ্ট তাই তাড়াতাড়ি পৌঁছলে তবেই নিজের পছন্দমত সময়ে showটি দেখতে পারবেন। গল্পের মাধ্যমে ভারত চিনের সম্পর্ক, বিবাদের কারণ, দালাই লামার ভারতে আসা, সৈন্যদের বীরগাথা এ সব কিছুই আমাদের সামনে তুলে ধরা হল। শেষে জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটল। স্টেডিয়াম থেকে বেড়িয়ে আমরা show দেখে যাদের জন্য গর্ববোধ করছি তাদেরকে দেখি একগাল হাসি নিয়ে আমাদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। অনেকেই তাদের জানাচ্ছেন তাদের show কত ভালো লেগেছে আর তাতেই তারা খুশি, এই পাওয়াটাই যেন তাদের সব থেকে বেশি পাওয়া।
এরপর আমরা সবাই হোমস্টেতে ফিরে এলাম। রাতে হোমস্টের ম্যাডাম আমার জন্য বানিয়ে আনলেন chicken churpa। চিকেন, কিছু সব্জি, সিমুইয়ের মত কিছু জিনিস, চিজ দিয়ে রান্না করা একটি রান্না -খেতে হবে ওখানকার local rice দিয়ে যা একটু লালচে হয়। আমার জিভের জন্য এটা অনেকটাই অন্যরকম একটা স্বাদ, খুব ভালো লেগেছিল। তাদের চোখেমুখে আমাকে নিজেদের খাবার খাওয়াতে পারার আনন্দটা দেখেও আমার খুব ভালো লাগছিল।


Dinner শেষে এবার আমরা ঘুমের দেশে পারি দিলাম, রেস্টটা খুব দরকার কারণ কালকে আমাদের গন্তব্য হতে চলেছে বুমলা পাস (ভারত-চিন সীমান্ত)সঙ্গে মাধুরী লেক যেখানে আমাদের প্রিয় নায়িকা মাধুরী দিক্ষিত নাচ করেছিলেন koyla সিনেমায়। তাই আজকের মত এই পর্ব এখানেই শেষ।

পরিচিতি:

Travel Vlogger, Content Writer
শেয়ার করুনঃ