Note: Now you can download articles as PDF format
  • Travel

ঈশ্বরের নিজের দেশ :কেরালা (অষ্টম পর্ব :মাটানচেরি প্যালেস বা ডাচ প্যালেস)

  • মীর হাকিমুল আলি
  • June 26, 2020
  • 56 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


প্রথম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

তৃতীয় পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

চতুর্থ পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

পঞ্চম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

ষষ্ঠ পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

সপ্তম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

ফোর্ট কোচির বোট জেটিতে নেমে l হেঁটে হেঁটে উঠলাম প্রধান রাস্তায় l এটা বাজার রোড l সোজা চলে গেছে মাটানচেরি l আমরা লোককে জিজ্ঞেস করে হাঁটতে লাগলাম l আকাশ ঘন নীল l রোদ ফেটে পড়ছে l গরমে ঘামে স্নান করে ফেলছি l রেস্ট নিতে নিতে হেঁটেই চলেছি l অদ্ভুত সুন্দর জায়গা এই ফোর্ট কোচি l ভারতেও এমন সুন্দর জায়গা আছে না গেলে বোঝা যাবে না l বিদেশিদের ছোঁয়া ছিল বলে জায়গাটা একদম ভিন্ন রকম l বাড়ি ঘর, রাস্তা সবই কেমন আকর্ষণীয় l দেওয়ালে দেওয়ালে পেইন্টিং l পুরানো উঁচু উঁচু ব্রিটিশ আমলের ঘর l পর্তুগীজ, ডাচ, জার্মান প্রভৃতি জাতি এখানে এক কালে তাদের ব্যবসা বাণিজ্য, জীবনের কিছু অংশ কাটিয়ে গিয়েছে l তার ছাপ গোটা ফোর্ট কোচি জুড়ে l যাইহোক, সামনে সমুদ্রের আর্দ্র নোনা বাতাসের জন্য ভ্যাপসা গরমে শরীর ঘামে একেবারে কাদা হয়ে যাচ্ছে l মাঝে মাঝে ছায়া দেখে দাঁড়াচ্ছি l রাস্তায় অটো চলছে খুব কম l ওই টুকু যেতে যা ভাড়া বলছে আমরা তো শুনে না করে দিলাম l হেঁটেই চলে যাবো l অতিরিক্ত ভাড়া চায়ছেl রাস্তায় ভীড় নেই l লোক জন খুব কম l দুই দিকে বাড়ি, মাঝে মাঝে বিভিন্ন দোকান l গুগুল ম্যাপ দেখে হেঁটেই চলেছি l

ডানদিকে একটা সুন্দর চার্চ দেখতে পেলাম l চার্চের নাম 'Our Lady Of Life Charch'. রাস্তার একদম ধারেই l গেট খোলা l লোকজন শূন্য l কি করি? ঢুকবো কিনা ভাবতে লাগলাম l কেউ যদি কিছু বলে? একটা লোক হেঁটে যাচ্ছিলো? তাকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম যে এখানে কি ঢোকা যাবে? আগেই বলেছি কেরালার মানুষ হিন্দি বলতে বা বুঝতে পারে না অনেকেই l কিন্তু ইংরেজি বেশ বোঝে ও বলে l লোকটাও ইংরেজিতে বললো অবশ্যই ঢুকতে পারি l ছবি তুলতে পারি কোনো সমস্যা নেই l শুনে সাহস হলো l সুন্দর গেট দিয়ে চার্চ এর চত্বরে ঢুকলাম l দারুন সুন্দর চার্চ l এদিক সেদিক ঘুরে দেখলাম ও ছবি তুললাম l

তারপর আবার হাঁটা দিলাম l আরও কিছুটা হেঁটে যেতেই নাকে খুব ঝাঁঝ অনুভব করতে শুরু করলাম l নাক জ্বালা করে হাঁচি হতে লাগলো, নাক দিয়ে জল ও ঝরতে শুরু করলো l রুমাল দিয়ে ঘাম মুছবো না নাক মুছব খুঁজে পাচ্ছিলাম না l কেন এরকম হচ্ছে? প্রশ্ন জাগার মুহুর্ত পরেই সামনে উত্তর এলো l সামনেই বিশাল মসলার বাজার l লরি তে শুকনো লঙ্কা বোঝায় হচ্ছে l চারদিকে বিভিন্ন মসলার গুদাম l নানা রকমের মসলার গন্ধ, ঝাঁঝ l এসব দোকানে বহু মানুষ কাজ করছে l বাঙালিও আছে নিশ্চয় l যাইহোক সত্বর গমনে ওখান টা পেরোলাম l তারপর আরও অবাক হতে লাগলাম l দুই দিকে শুধু দোকান আর দোকান l বাইরে পসরা সাজানো l কাঠ, ঝিনুক, মাটি ইত্যাদি দিয়ে বানানো খুব সুন্দর সুন্দর জিনিস l এগুলো মূলত পর্যটকদের জন্যই l কেননা এখানকার আর কে এসব কিনবে? দারুন দারুন জিনিস বাড়িতে সাজিয়ে রাখার l ভয়ে ছবি তুলিনি l দুচোখ ভরে দেখে দেখে চললাম l কিনিও নি l কেননা দাম বেশ চড়া l এতো টাকা নেই কাছে l

যাইহোক আরও কিছুটা যেতেই রাস্তার ভীড়, লোকজন, গাড়ি- ঘোড়া কেমন বেড়ে গেলো l বুজলাম এখানেই ওই ডাচ প্যালেস আছে হয়তো l অনুমান সত্যিই হলো l রাস্তার ধারে বোর্ডে লেখা ডাচ প্যালেস l চারদিকে দোকানপাট l বড়ো বড়ো গাছ রাস্তার ধারে l তার ডালপালার ছায়া রাস্তার ওপর পড়েছে l গরম টা কমলো একটু l রাস্তায় ঝরা পাতা পড়ে চারদিকে l খুব সুন্দর একটা পরিবেশ l দেশি বিদেশি টুরিস্ট ঘুরে বেড়াচ্ছে l ডাচ প্যালেসে ঢুকতে হলে টিকিট কাটতে হয় সম্ভবত l ঠিক মনে করতে পারছিনা l হলুদ বা মেটে রঙের বড়ো বিল্ডিং l ওপরে টালির ছাউনি বা ওই রকম ডিজাইন l বাইরের এক সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে হয় দোতলায় l সেখান থেকেই মিউজিয়াম শুরু l এই মিউজিয়ামের ভেতরে এতো কিছু দেখার আছে তা লিখে শেষ করতে পারবো না l আর ছবি তোলাও সম্ভব হয়নি এতো l যাইহোক তবুও দু চার কথা এই মাটানচেরি প্যালেস সম্পর্কে না বললেই নয় l

মাটানচেরি প্যালেস হলো একটি পর্তুগীজ সংগ্রহশালা যা ডাচ প্যালেস নামেও পরিচিত l এটি ভারতের কেরালার কোচিএর ফোর্ট কোচি অংশের মাটানচেরি নামক জায়গায় অবস্থিত l এটি একটি হেরিটেজ ভবন l

১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা এই প্রাসাদ টা তৈরি করে উপহার হিসেবে কোচিন এর রাজা কে দিয়েছিলেনl ডাচ ওলন্দাজরা এই প্রাসাদের কিছু সংস্করণ ও বৃদ্ধি করে সম্পূর্ণ রূপ দিয়েছিল ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দেl তারপর থেকে এটাকে ডাচ প্যালেসও বলা হয় l তারপর ভারতীয় রাজারাও এর উন্নতিসাধন করেন l বর্তমানে এটি কোচিন রাজাদের প্রতিকৃতি এবং ভারতের কিছু উল্লেখযোগ্য পৌরাণিক দেওয়াল চিত্র, কোচিন রাজাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র ও পর্তুগীজদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র এর এক বিশাল সংগ্রহশালাl ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভাস্কো-ডা-গামা কাপ্পাড নামক জায়গায় এলে কোচিনের রাজারা তাঁকে অভিনন্দন জানান l ও এই মাটানচেরিতে আমন্ত্রণ করেন l এখনো ওখানে ভাস্কো ডা গামার কবর আছে l জমারিয়ান্স এর প্রতিহত করে পর্তুগীজরা এখানে এক চেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে l কোচিনের রাজারা হাতের পুতুলে পরিণত হন l পরে ডাচ রা পর্তুগীজদের উৎখাত করে মাটানচেরির দায়িত্ব গ্রহণ করে l পবর্তীকালে এই অঞ্চল হায়দার আলী এবং আরো পরবর্তীকালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়ার অধীনে আসে l

এই প্যালেসটি চতুর্ভুজাকার l নালুকেতু স্টাইলে বানানোl আর এই নালুকেত্তু হল কেরালার একটি শৈলী l অর্থাৎ এই শৈলীতে চারদিকে প্রাসাদ এবং মাঝখানে উঠোন বা ফাঁকা জায়গা থাকেl আরসি উঠোনে থাকে একটি মন্দিরl আর মন্দির পাজায়নূর ভগবতী দেবীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে l এই দেবী কোচিন রাজ পরিবারের রক্ষার দেবী l এই প্রাসাদের দুপাশে আরো দুটো মন্দির আছে যার মধ্যে একটি প্রভু কৃষ্ণের এবং অপরটি প্রভু শিব কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলl এই মন্দির গুলি এবং এই প্যালেসের ছাউনি অনেকটা ধনু আকৃতির এবং কামরা গুলি ইউরোপীয়দের প্রভাব লক্ষ্য করার মতোl ডাইনিং হল টি বাঁকানো কাঠের দ্বারা সজ্জিত এবং ছাদটি অসংখ্য পিতলের বার দিয়ে নির্মিত l এমনকি এই প্রাসাদ কেরালার মেঝের ঐতিহ্যের একটি বিরল উদাহরণ যা দেখলে মনে হয় পালিশ করা কালো পাথর কিন্তু আসলে এটা হলো পোড়া নারকেল মালার চারকোল, চুন, রসালো গাছ, ডিমের খোল এর মিশ্রণ l

দেওয়াল জুড়ে আছে বিভিন্ন ধরনের পৌরাণিক কাহিনীর চিত্রl আছে রাধা কৃষ্ণের কৃষ্ণ লীলাl রামায়ণের বিভিন্ন দৃশ্যl এছাড়া এই মিউজিয়ামটি তে দেখতে পাওয়া যায় তখনকার যুগের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসপত্রl রাজা-রাণীদের পোশাক, বসার সোফা, সিংহাসন, পালকিl এছাড়াও তখনকার এর বিভিন্ন মুদ্রা সংরক্ষণ করে রাখা আছে এই মিউজিয়ামেl
ঘন্টা খানেক ধরে ঘুরে ঘুরে দেখে বেরিয়ে এলাম এই প্যালেস থেকে l রয়ে গেলো মধুর স্মৃতি l

পরের পর্ব ক্রমশ......

 

পরিচিতি:

মীর হাকিমুল আলি পেশায় একজন গৃহশিক্ষক এবং একটি বিদ্যালয়ের আংশিক সময়ের শিক্ষক (ভূগোল)। বিভিন্ন জায়গা সম্পর্কে জানা, সেখানকার মানুষদের পোশাক, বাড়িঘর কেমন, ভাষা, উৎসব, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছোটো থেকেই তাই ভূগোল বিষয় নিয়ে পড়ার একটা আলাদা আগ্রহ তৈরী হয়l স্কুল জীবনে কাছাকাছি ঘুরতে গেলেও কলেজ এক্সকারসন থেকেই তার ভ্রমণ একটি নেশায় পরিণত হয়l তারপর একটু একটু করে তা বাড়তে থাকেl বর্তমানে তার বয়স ২৬ ইতিমধ্যে ভারতের কয়েকটা রাজ্যের কিয়দংশ ঘুরে ফেলেছেন তিনিl সেগুলি হলো পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল ইত্যাদিl তবে গোটা ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশ ঘোরার ইচ্ছা তার বরাবরেরl ঘোরার পাশাপাশি ছবি তুলতেও আগ্রহী লেখক।
শেয়ার করুনঃ