Note: Now you can download articles as PDF format
বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য 9564866684 এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন
  • Travel

ঈশ্বরের নিজের দেশ : কেরালা (চতুর্থ পর্ব : কোঝিকোড় সমুদ্র সৈকত)

  • মীর হাকিমুল আলি
  • June 5, 2020
  • 142 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


প্রথম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

দ্বিতীয় পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

তৃতীয় পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

কোঝিকোড়ের দর্শনীয় জায়গাগুলির মধ্যে শহরের একদম পশ্চিমপ্রান্তে বিস্তৃত সমুদ্র সৈকত প্রথম সারিতে স্থান পায় l কোঝিকোড় এর মানুষের বিনোদন ও সময় কাটানোর প্রাণ কেন্দ্র বলা যেতে পারে l আমাদের পশ্চিমবঙ্গের যেমন দীঘা সেরকমই আরকি l কোঝিকোড় শহরের প্রান্ত ভাগে রেললাইন পেরিয়ে আরও কিছুক্ষন হাঁটলে মিলবে গান্ধী রোড l একবার মহাত্মা গান্ধী এখানে এসেছিলেন তাই 1934 সাল থেকে এই রোডের নাম গান্ধী রোড l এই গান্ধী রোড এর সমান্তরালে বাম দিকে কোঝিকোড় বীচ l মালাবার উপকূলেরে এই বীচ অত্যন্ত সুন্দর l পরিষ্কার পরিছন্নতা, জলের স্বচ্ছতার বিচারে দীঘা পুরি হার মানতে বাধ্য l আরব সাগরের শুভ্র জলরাশি আছঁড়ে পড়ছে বালুকা বেলায় l

পুরীর মতো এতটা বালির বিস্তার এখানে নেই l জল খুব কাছেই l বেশ ঢালু আর গভীর l জলের গর্জন মনে রাখার মতো l কোঝিকোড় এর বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন রাজনৈতিক শোভা, ধর্মীয় কোন অনুষ্ঠান, জন্মদিন পার্টি, এমনকি বিবাহ পার্টিও এই বীচের ধারে অনুষ্ঠিত হয় l বীচের সমান্তরালে রাস্তা l মেরিন ড্রাইভl প্রায় 28 কিমি l কাপ্পাড বীচ থেকে বেপোর বীচ পর্যন্ত l বীচের সমান্তরালে উঁচু কংক্রিট দিয়ে বাঁধানো সুন্দর রাস্তা ও ধারে ধারে অপূর্ব সুন্দর ল্যাম্প পোস্ট l বসার জন্য ভিন্ন ভিন্ন বসার বেঞ্চ l পাথরের কারুকার্য ও বিভিন্ন মূর্তি দেখার মতো l বিভিন্ন সি ফুড মানুষ মজা করে খায় l বিশেষ করে বিভিন্ন ফল কাঁচের বয়ামে বয়ামে রাখা l মিক্স ফ্রুইটস এর প্লেট বড্ডো কালারফুল।

এই বীচ এর একটা ইতিহাস আছে l আগে এর নাম ছিল কালিকট l এখানে ছিল প্রাচীন বন্দর কালিকট বন্দর l সেই বন্দরের ধ্বংসাবশেষ এখনো আছে l এটাই এই বীচের মূল আকর্ষণ পর্যটকদের কাছে l

এই সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য্য এক এক সময় এক এক রকম l বর্ষায় এক ভয়ঙ্কর রূপ l অন্য ঋতুতে অন্যরকম l সকাল বিকাল এতটাই স্নিগ্ধ এই জায়গা যে মানুষের ঢল নামে এখানে l সূর্যাস্ত দেখার আদর্শ বীচ এই কোঝিকোড় বীচ l প্রাচীন বন্দরের ভগ্নাবশেষের ওপর যখন সন্ধ্যা নেমে আসে সূর্য ঢোলে পড়ে দিগন্তে, ডুব দিতে চায় আরব সাগরের বুকে তখন দেখার মতো সেই দৃশ্য মনের মনিকোঠায় যতনে রাখার মতোই বিষয় l

আমরা দুজনে হেঁটে হেঁটে পৌঁছলাম বীচের ধারে l তখন প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে l সূর্যাস্ত হতে প্রায় দেড় ঘন্টা বাকি l ওদিকে প্রায় সাত টার দিকে সূর্য ডুবে l আমরা ঘুরতে ঘুরতে ছবি তুলছি l সমুদ্রের উর্মিমালা আছঁড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে l আর তার সেই বিশেষ শব্দ মনে পুলক বর্ষণ করছে l একটা শীতল বাতাস শরীর মনকে উদাস করে যাচ্ছে l বেশিরভাগ লোক সাদা লুঙ্গি কালো জামা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমনকী একই পোশাকে বাচ্চাদের ও দেখলাম l খুব সুন্দর লাগছিলো l প্রেমিক - প্রেমিকাদের ঢলাঢলি, বুড়ো বুড়িদের চুলোচুলি, বন্ধু- বান্ধবদের কোলাকুলি আর কচিকাঁচাদের খুঁনসিটি সব মিলিয়ে আনন্দঘন একটা পরিবেশ l জলতরঙ্গের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে নোনা বাতাস l হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা চলে গেলাম l দেখলাম রাস্তা অবরোধ করে কোনো নেতার মিথ্যা ভাষণ শুনছে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে l বুঝলাম রাজনীতির ছোট্ট সভা l যাইহোক সেটা পেরিয়ে আরও কিছুক্ষন হাঁটলাম lতারপর এক সময় কংক্রিটের সেই বসার জায়গা গুলো, হাঁটার সুন্দর পথ শেষ হয়ে গেলো l শুরু হলো বালি আর বালি l সেদিকটা সি ফুড আর বিভিন্ন স্ট্রিট ফুড, পানীয়, আইসক্রিম, মিক্স ফ্রুইটস এর দোকানের সারি l বহু মানুষ ভিড় জমিয়ে সেসবের আস্বাদ গ্রহণ করে রসনা তৃপ্তি করছে l আমরাও আর বাদ যায় কেন l যদিও স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর ওরকম খোলামেলা জায়গায় সাজানো ফল খাওয়া l তবুও তারা সুন্দর করে ধুয়ে দিলো l নানান ফল খেলাম l গরমে বেশ ভালোই লাগছিলো l আম খেলাম কাঁচা l খুব ইচ্ছে করছিলো কারণ তখন আমাদের পশ্চিমবঙ্গে আমের মুকুল দেখে গিয়েছি মাত্র l তাই আম দেখে লোভ সামলাতে পারলাম না l খাওয়া সেরে আরও এগিয়ে গেলাম l রঙিন রঙিন নৌকা খাঁড়া করে রেখেছে এক জায়গায় l গাড়ির চাকার টায়ার কে রঙ করে সুন্দর সব ছবি তোলার জায়গা করা আছে l আমি ছবি (নিজের ও প্রকৃতির ) তুলতে বড্ডো ভালোবাসি l তাই বাকি থাকলো না ছবি তুলতে l

আরও এগিয়ে যেতে লাগলাম l কিছুটা গিয়ে দেখি বীচটা কেমন বেঁকে গেছে সমুদ্রের দিকে l বড় বড় পাথর দিয়ে বাঁধানো বাঁধ আমাদের রাস্তা ঘিরে দাঁড়ালো l পাথরে সাবধানে পা দিয়ে দিয়ে উঠলাম l বেশ উঁচু l উঠে যা দেখলাম তা বর্ণনাতীত l দেখি দুই দিকে গোল করে এরকম পাথর দিয়ে বাঁধ তৈরী করা l শুধু পশ্চিম দিক অর্থাৎ সমুদ্রের দিকে কিছুটা উন্মুক্ত l বাঁধ নেই l আর পূর্ব দিকে বালির বিশাল তটভূমি l আর মাঝে একটা আসতো উপহ্রদ ধরণের l আর সেখানে কিলবিল করছে ছোট বড় নানান রঙের মাছ ধরার (সম্ভবত ) ট্রলার আর নৌকো l সেখানেই সমুদ্রের জল ঢুকছে l ঢেউ আছঁড়ে পড়ছে পাথরের বাঁধে l দুটো পাথরের বাঁধের মাঝে নিচু রাস্তা l চলে গেছে সমুদ্রের দিকে l অনেকটা জায়গা জুড়ে এই এলাহী কান্ড কারখানা l নিজের চোখে না দেখলে বোঝানো মুশকিল l কিছুক্ষন বসে বসে নিরিবিলি ওই জায়গার মজা নিলাম l ওখানে লোকজন কম l জলের ঢেউয়ে বাঁধা নৌকো গুলো দুলছে l আর এরকম শয়ে শয়ে নৌকার নাচ দেখতে কার না ভালো লাগে? তাই ওখান থেকে ফিরতে ইচ্ছে করছিলো না l কিন্তু আমরা অনেকটা দূরে আছি l আবার সেই বন্দরের দিকে যেতে যেতে আধ ঘন্টা সময় লাগবে l ওদিকে সূর্য প্রায় ঢুলে পড়েছে l তাই দেরি না করে আবার হাঁটা দিলাম l

বাম দিকে আকাশ চুম্বি শহর l উঁচু উঁচু বিল্ডিং l রাস্তা l ব্যস্ত শহুরে জীবন l আর দান দিকে আদিগন্ত বিস্তৃত আরব সাগর আর তার নিজের ছন্দে নৃত্যের আসর l শুধু যাওয়া আর আসা, শুধু স্রোতে ভাসা l সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে ডেউয়ের শেষ সীমা বরাবর হেঁটে হেঁটে চলেছি l সূর্যও আমাদের সাথে হেঁটে চলেছে l এবার সে একদম সমদ্রের কাছাকাছি l ডুব দেবে শীতল সাগরের গহীন জলে l তার আর দেরি নেই l জোরে জোরে পা চালালাম l যখন এসে পৌঁছলাম কালিকট বন্দরের কাছে তখন সূর্য অস্তমিত l আর সেই রূপ অবর্ণনীয় l আসতে আসতে সব ল্যাম্প পোস্ট জ্বলে উঠলো l ওদিকের শহর ঝলসে উঠলো বিজলিবাতির আলোয় l বহুতল বাড়ি গুলি আলো জ্বলার পর যেন পায়রার খোপ মনে হচ্ছিলো l সমুদ্র বায়ুর বেগ বেড়েছে আস্তে আস্তে l আঁধার নেমে এলো l ভিড় কমতে শুরু করলো চারদিকে l একটা বসার জায়গায় গিয়ে বাদাম ভাজা আর ভুট্টা ভাজা কিনে নিয়ে গিয়ে চুপ করে বসলাম আমি আর বন্ধু l খাচ্ছি l কিন্তু কথা বার্তা নেই l আধো আলো আধো অন্ধকারেও জল তরঙ্গের সাদা ফেনার ছবি চোখের সম্মুখে দেখতে পাচ্ছি l শব্দ আরও বেড়ে গেলো l এক মনে দেখিছি l কেমন ভাবুক হয়ে উঠলো মন l কোথায় পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরের একটা ছোট্ট গ্রাম ছেড়ে একেবারে ভারতবর্ষের দক্ষিণ পশ্চিম দিকে এক শহরের শেষ প্রান্তে, বলা যেতে পারে ভারতবর্ষের শেষ প্রান্তে আরব সাগরের তীরে এই অন্ধকার মায়াবী পরিবেশে বসে আছিl

ভাবতেও পারিনি এরকম ভাবি স্বপ্নটা সত্যি হয়ে যাবেl ভাবতে লাগলাম আজ থেকে কত বছর আগে সেই 1498 সালে ভাস্কো ডা গামা কি এখানেই পৌঁছে ছিলেন? জানিনা l সমুদ্র তরঙ্গের যাওয়া-আসা কেবল চোখের সামনে ভেসে উঠছে আর সেই ঊর্মিভঙ্গ শব্দ কর্ণকুহরে প্রবেশ করে মনের ভিতর পুলক বর্ষণ করে চলেছেl কেমন একটা আনমনা হয় কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম আমি কিন্তু সহসা সম্বিত ফিরল বন্ধু একটা ঠেলা দেওয়াতে l বললো এবার চলো l অনেকটা হেঁটে যেতে হবে l তারপর খেতে হবে l রাতে ট্রেন আছে l ট্রেন ধরে যাবো এর্নাকুলাম l কি আর করা যাবে কোঝিকোড় সৈকতকে বিদায় জানিয়ে হাঁটা দিলাম আবার l মনে মনে ভাবলাম জানিনা জীবনে আর কোনোদিন এই কালিকট সৈকতে আর পা পড়বে কিনা l হয়তো এটাই শেষ l

পরের পর্ব ক্রমশ.....

পরিচিতি:

মীর হাকিমুল আলি পেশায় একজন গৃহশিক্ষক এবং একটি বিদ্যালয়ের আংশিক সময়ের শিক্ষক (ভূগোল)। বিভিন্ন জায়গা সম্পর্কে জানা, সেখানকার মানুষদের পোশাক, বাড়িঘর কেমন, ভাষা, উৎসব, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছোটো থেকেই তাই ভূগোল বিষয় নিয়ে পড়ার একটা আলাদা আগ্রহ তৈরী হয়l স্কুল জীবনে কাছাকাছি ঘুরতে গেলেও কলেজ এক্সকারসন থেকেই তার ভ্রমণ একটি নেশায় পরিণত হয়l তারপর একটু একটু করে তা বাড়তে থাকেl বর্তমানে তার বয়স ২৬ ইতিমধ্যে ভারতের কয়েকটা রাজ্যের কিয়দংশ ঘুরে ফেলেছেন তিনিl সেগুলি হলো পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল ইত্যাদিl তবে গোটা ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশ ঘোরার ইচ্ছা তার বরাবরেরl ঘোরার পাশাপাশি ছবি তুলতেও আগ্রহী লেখক।
শেয়ার করুনঃ