Note: Now you can download articles as PDF format
বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য 9564866684 এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন
  • Travel

ঈশ্বরের নিজের দেশ : কেরালা (দ্বিতীয় পর্ব : চেন্নাই টু কোঝিকোড়)

  • মীর হাকিমুল আলি
  • May 24, 2020
  • 213 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


প্রথম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

ক্লান্ত হয়ে চেন্নাই সেন্ট্রাল স্টেশনে বসে আছি l ট্রেন রাত আটটায় l আর আধ ঘন্টার মধ্যেই ট্রেন এসে যাবে l আমরা অপেক্ষা করার চেয়ারের সারি গুলিতে বসে আছি l মাঝে মাঝে ডিসপ্লে বোর্ডের দিকে চোখ বুলাচ্ছি l সারাক্ষন ট্রেনের যাওয়া আসার এনাউন্সমেন্ট কান একেবারে ঝালাপালা করে তুলেছেl এতো বড় স্টেশনের ভেতরের চারদিকটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি l কত রকমের ছবি l মাদ্রাজ স্টেশনের পুরানো সাদাকালো ছবি থেকে শুরু করে গান্ধীজি মোদীজি সবার ছবি স্টেশন জুড়ে l কেরালা তামিলনাড়ুর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের ছবিও চারদিকে শোভা পাচ্ছে l কিছুটা হাওড়া শিয়ালদাহ এর মতোই ব্যস্ত স্টেশন এই চেন্নাই সেন্ট্রাল l বন্ধু হেডফোনে গান শুনছে l আমি হেডফোন সাধারণত ব্যবহার করিনা l খুব কম l আর কোথাও গেলে একদম ব্যবহার করিনা l কারণ আমার চারদিকের বিচিত্র শব্দ শোনা লাগবে, বিচিত্র দৃশ্য দেখা লাগবে তাই l গান বাড়িতেও শোনা যাবে l যাইহোক ট্রেনের সময় হয়ে গেলো l যথারীতি সম্ভবত আট নং প্লাটফর্মে ট্রেন এলো l ম্যাঙ্গালোর মেইল l আমাদের এটার টিকিটও কন্ফার্ম ছিল তাই কোনো অসুবিধে হলো না l

ট্রেন ধরবো বলে যখন জোরে জোরে চলছি দেখছি বস্তা বস্তা আম ট্রেন থেকে নামানো হচ্ছে l ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহ l তখন আমাদের দিকে সবে আমের বকুল l আর ওদিকে এতো বড় বড় আম ফলে গেছে ইতিমধ্যেই l দেখে অবাক হলাম বৈকি l অবাক হলাম বলে কিন্তু থেমে থাকিনি l ছুটে গিয়ে ট্রেনে উঠলাম l নিজেদের সিটে ব্যাগ পত্র রেখে দিয়ে ফ্যান এর তলায় দাঁড়ালাম l উফফফ কি ভীষণ গরম l যদিও আমাদের পশ্চিমবঙ্গে তখন বেশ শীতের দাপট l কিন্তু দক্ষিণ ভারতে তখন ভালোই গরম l কিছুক্ষনের মধ্যেই ট্রেন ভরে গেলো মানুষে l ট্রেন ছেড়েও দিলো l বন্ধুর সাথে এটা সেটা গল্প গুজব করে সময় কাটলো কিছুটা l এখন জানালার ধারে সিট্ পড়েনি l রাতে আর দেখবোই বা কি? রাত দশটার পর আমরা রাতের খাবার সেরে ফেললাম l চেন্নাই এর সেই বাঙালি হোটেল থেকে মাছ ভাত পার্সেল করে নিয়ে এসেছিলাম l আমি কিছুটা খেলাম l কিন্তু আমার বন্ধুটা একটু খেয়েই সব রেখে দিলো l ও বড্ডো কম খায় l যাইহোক খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে বাথরুম থেকে ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম l ফোন ঘেঁটে ঘেঁটে ঘুম এলো দেরি করে l চির পরিচিত রাতের ট্রেন চলার আওয়াজ হয়েই চলেছে l শুয়ে শুয়ে শরীর খানা এদিক ওদিক করে হালকা দুলছে l ট্রেনে শুয়ে শুয়ে এই দোলন টা আমার বেশ ভালো লাগে lট্রেনে প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে l এক আধ জন বাথরুম যাওয়ার জন্য এদিক সেদিক যাওয়া আশা করছে l আলো সব নিভে গেছে l শুধু ফ্যান চলার ঝাঁ ঝাঁ শব্দ আর বাইরে থেকে ট্রেন ছোটার শব্দ l ফোন ব্যাগের মধ্যে রেখে ঘুমিয়ে গেলাম l

ঘুম থেকে উঠে ওপরের সিট্ থেকে নেমে এসে দেখি সকাল হয়ে গেছে l কেউ কেউ ঘুম থেকে উঠেছে l বেশিরভাগ লোক এখনো নাক দেখে ঘুমোচ্ছে l আমি জানালার ধারের সিট্ টায় অল্প জায়গা নিয়ে বসলাম l জানালার দিকে গলা বাড়িয়ে দেখেই বুঝতে বাকি রইলো না যে, আমরা ঈশ্বরের দেশে এসে গেছি l সকালের বেশ শীতল বাতাস ঢুকছে জানালা দিয়ে l আর একটা সবুজ ভিজে ভিজে গন্ধ l চেয়েই আছি l শুধুই সবুজ গাছ পালা l রেললাইনের ধারে কিছুটা দূরে ঘরবাড়ি l প্রত্যেকটা বাড়ী প্রায় একই রকম গঠন l লাল লাল টালি দিয়ে ছাওয়া একতলা বাড়ী l অনেকটা আমাদের বাংলার মাটির কোঠা বাড়ির মতো l আর প্রত্যেকটা বাড়িতে কয়েকশোটা করে নারকেল গাছ l রাস্তাও শেষ হয়না, শেষ হয়না নারকেলের সারি l অন্যান্য গাছের সাথে শুধুই নারকেল গাছই চোখে পড়ছে l ছোট বড় জলাশয় - জলাজমি আর ধারে নারকেল গাছ, আর তাতে নৌকা ভাসছে l হ্যাঁ, এটাই তো কেরালা l এসব নিয়েই কেরালা l

দেখতে দেখতে বেলা বাড়তে শুরু করলো l লোকজন সব উঠে গেছে l নীরবতা আর মোটেও রইলো না l চা থেকে ব্রেড ওমলেট, ট্রেনের ক্যান্টিন থেকে হকাররা ডাক পেড়ে আবহাওয়া মুখর করে তুললো l ঘড়িতে তখন সাড়ে সাতটা বাজে l একটা সুন্দরী নদীর সাথে দেখা l বেশ চওড়া l জল একদম শান্ত l একটা হালকা কুয়াশার মতো নদীর ওপর বেষ্টন করে আছে l ধারে ধারে সবুজ ঝোপ l আর একদিকে নারকেল গাছের সারি l বেঁকে মাথা তুলে নদীর ওপর ঢুলে পড়তে চায় যেন l নদীর মাঝে একটা দুটা নৌকা অতি ক্ষুদ্র দেখাচ্ছে l আর নদীর তীরে বড় মাপের নৌকা যেগুলো গোল মতো ঝাঁপ দিয়ে ঘেরা, বাঁধা আছে l কয়েকটা ছবি তুলে নিলাম l

এরপর ব্রাশ করতে করতে ট্রেনের দরজা গোড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি বন্ধুও ব্রাশ করতে করতে এসে বললো 'তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে নাও, আর 5/10 মিনিটের মধ্যেই আমাদের নামতে হবে 'l শুনে তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে নিলাম l ও বললো 'এবার একটা সরু নদী পড়বে, ওটা পেরোলেই কোঝিকোড় স্টেশন l এই নদীর নাম কাল্লায় l এই নদীতে চিরদিন মোটা মোটা কাঠের গুঁড়ি ভাসানো থাকে l এটা কেরালার বিখ্যাত কাঠের শিল্পের কেন্দ্র l এই নদীর তীরে চলে গাছের গুঁড়ি o টিম্বার কেনা বেচা l বহু যুগ ধরে হয়ে আসছে l তাই নদীর জল পরিষ্কার নয় l কেমন কালো ধরণের 'l ঠিক তাই ই দেখলাম l নদী পেরিয়ে মাত্র পাঁচ মিনিট পরে কোঝিকোড় স্টেশনে পৌঁছলাম l আগে এই জায়গার নাম ছিল কালিকট l নিজেকে কেমন ভাস্কো ডা গামা মনে হচ্ছিলো l মজা করে বললাম l যাইহোক স্টেশন টা খুব সুন্দর l ওভার ব্রিজ থেকে একটা ছবি তুললাম স্টেশনের l বাইরে বেরিয়েও তুললাম কয়েকটা l অবশেষে পৌঁছলাম অনেক প্রত্যাশিত ভগবানের দেশে l

 

আচ্ছা আমরা কোঝকোডে নামলাম কেন? তবে বলি - কোঝিকোড় জেলায় আমার ওই প্ৰিয় বন্ধু ও তার দাদারা ও সঙ্গী সাথীরা কাজ করে l এখন আমরা ওদের মেসেই যাবো l ওরা থাকে কোঝিকোড় স্টেশন থেকে প্রায় 15/18 কিমি দূরে কন্যামঙ্গলম বলে একটা জায়গায় l তাই বাস স্টপ থেকে বাস ধরতে হবে এখন l ব্যাগ পত্র টেনে টুনে স্টেশন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে লাগলাম l বন্ধু বললো খুব একটা দূর নয় lকিন্তু শরীরটা হালকা খারাপ লাগছে l সকাল থেকে খালি পেটে আছি l যাইহোক সেটা বন্ধুকে বললাম না l

আমরা একটা সুন্দর পাকা রাস্তা দিয়ে দিয়ে হাঁটতে লাগলাম ফুটপাত ধরে l বন্ধু বললো ওটা সুইট মিট স্ট্রিট l এখানে মসলা ও বিভিন্ন মিষ্টি খাবার বিখ্যাত l এখন এতো সকাল তাই দোকান সব বন্ধ l আর রাস্তা একদম ফাঁকা l দেরি করে ভিড় থেকে যাওয়া মুসকিল l যাইহোক এই সুইট মিট স্ট্রিট এর গল্প অন্য এক পর্বে বলবো l আমরা বাস স্টপে পৌঁছলাম lতখন ঘড়িতে আটটা দশ l বাস স্টপের কাছে কোঝিকোড় স্পোর্ট এর একটা অফিস l সামনে বেশ সুন্দর একটা জায়গা l বসার জায়গা করা আছে l চারদিক অত্যন্ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন l কেরালার কোনো এক বিখ্যাত মানুষের বেশ বড় এক স্ট্যাচু l বসার জায়গা গুলোর পেছনের পাঁচিলের দেওয়ালে নানার ছবি খোদায় করে সোনালী রঙ করা l যা চকচক করছে l সুন্দর সুন্দর ল্যাম্প পোস্ট জায়গাটার সৌন্দর্য্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে l যাইহোক বেশিক্ষন দাঁড়াতে হলো না l বাস এসে গেলো l উঠে দেখি বাস ফাঁকা l সিটে গিয়ে বসলাম জানালার ধারে l একে একে মানিনচিরা স্কয়ার, পার্ক এসব পেরিয়ে ছুটে চললাম l

সকালের কোঝিকোড় শহরে বেশি ভিড় নেই l চোখে পড়লো বেশ কয়েকটি গির্জা l বুঝলাম এখানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা বেশ ভালো পরিমানেই বাস করে l তারপর বন্ধু বলে যেতে লাগলো এটা অমুক, এটা তসুক l এটা হাসপাতাল তো ওটা স্কুল l কিন্তু বাসে বসে বসে খালি পেট কেমন গুলিয়ে উঠতে লাগলো l মাথাটা ধরেছে বেশ l তাই বাইরের আর কিছু দেখতেও ইচ্ছে করছিলো না l এই ভাবে আধ ঘন্টা পরেই পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে l রাস্তার ধারেই একটা বিরাট বড় হার্ডওয়্যার দোকান l আর তার পেছনেই ওদের মেস l চারদিকে আম আর কলা, নারকেল গাছের বন l মাঝে এই মেস l সুন্দর পরিবেশ l মেসে ঢুকতে প্রথমে একটু কেমন লজ্জা বোধ হলো l ঢুকে দেখি একজন বসে আছে l আর কেউ নেই মেস ফাঁকা l জানতে পারলাম ওটা বন্ধুর দাদা l কথা বললাম l খুব মজার মানুষ l রাস্তায় কোনো সমস্যা হলো কিনা, কি কি খেয়েছি, কোথায় বাড়ী সব গল্প গুজব হলো l তারপর বন্ধু বাথরুম দেখিয়ে স্নান সেরে নিতে বলল l আমিও দেরি না করে বাথরুমে ঢুকলাম l দুই দিন স্নান করা হয়নি l এদিকে গরমে যেন জীবন বেরোয় বেরোয় l তার ওপর শরীরটা খারাপ লাগছে lতাই ঠান্ডা জলে শরীর সিক্ত করে এসে বসলাম l এখন একটু আরাম পেলাম l বন্ধুও স্নান সেরে এসে আমাদের তিন জনের জন্য পান্তা নিয়ে এলো রান্না ঘর থেকে l সাথে পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে মাছ ভাজা মাখা l আর কাঁচা লঙ্কা l কি যে তৃপ্তি করে খেলাম বলে বোঝাতে পারবো না l তারপর বন্ধু বললো সে নিজে রান্না করবে l আমি যেন একটু ঘুমিয়ে পড়ি l শরীরটা ভালো লাগবে তবে l তার কথা মতো মোবাইল চার্জ এ বসিয়ে শুয়ে পড়লাম l শরীর যেন ট্রেনের মতোই দুলছে, বাথরুমে বসেও একই রকম হচ্ছিলো l এটা হয় ই ট্রেন জার্নির পর l যাইহোক পান্তা খাওয়ার এফেক্ট আর জার্নি জনিত ক্লান্তি l ঘুম কখন যে এসে গেলো বুঝতেই পারলাম না l

পরের পর্ব ক্রমশ...

পরিচিতি:

মীর হাকিমুল আলি পেশায় একজন গৃহশিক্ষক এবং একটি বিদ্যালয়ের আংশিক সময়ের শিক্ষক (ভূগোল)। বিভিন্ন জায়গা সম্পর্কে জানা, সেখানকার মানুষদের পোশাক, বাড়িঘর কেমন, ভাষা, উৎসব, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছোটো থেকেই তাই ভূগোল বিষয় নিয়ে পড়ার একটা আলাদা আগ্রহ তৈরী হয়l স্কুল জীবনে কাছাকাছি ঘুরতে গেলেও কলেজ এক্সকারসন থেকেই তার ভ্রমণ একটি নেশায় পরিণত হয়l তারপর একটু একটু করে তা বাড়তে থাকেl বর্তমানে তার বয়স ২৬ ইতিমধ্যে ভারতের কয়েকটা রাজ্যের কিয়দংশ ঘুরে ফেলেছেন তিনিl সেগুলি হলো পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল ইত্যাদিl তবে গোটা ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশ ঘোরার ইচ্ছা তার বরাবরেরl ঘোরার পাশাপাশি ছবি তুলতেও আগ্রহী লেখক।
শেয়ার করুনঃ