Note: Now you can download articles as PDF format
বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য 9564866684 এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন
  • Travel

ভুবনেশ্বরে ঐতিহাসিক গিরিরাজের সন্ধানে(শেষ পর্ব : লিঙ্গরাজ মন্দির...শৈব ধর্ম ও বৈষ্ণব ধর্মের মিলনক্ষেত্র)

  • সন্দীপ কুমার রাজচক্রবর্তী
  • May 17, 2020
  • 181 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


প্রথম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

"পৃথিবী একটা বই আর যারা ভ্রমণ করে না তারা বইটি পড়তে পারে না।"....সেন্ট অগাস্টিন

আগের পর্বে র থেকে নিয়ে ভূমিকার প্রসঙ্গ কিছুটা দেওয়া হলো
দুনিয়ার সব বৈচিত্র্য যেন ধারণ করেছে একা ভারত। এক দিকে গভীর অরণ্য, আরেক দিকে তপ্ত মরুভূমি, এক দিকে সমুদ্র আরেক দিকে সুউচ্চ পর্বতমালা, এক দিকে প্রাচীন জীবনধারায় স্থিত জনগোষ্ঠী অন্য দিকে অতি আধুনিক জীবনযাত্রা, এক দিকে সুপ্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সমাহার আরেক দিকে অত্যাধুনিক স্থাপত্য। অজস্র ভাষা ও লিপির বৈচিত্র্যও এর অন্যতম আকর্ষণ। সহস্র বছরের প্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ যে ভূ-খণ্ড তার অর্ধ সহস্র অংশই রচনা করেছে অনেক জাতি।

৯ই মার্চ বেড়িয়েপড়েছিলাম পুরীর উদ্দেশ্যে।রাতের সফরের ট্রেন যাত্রা আমার আবার খুব ভালো লাগে।

"রেলগাড়িটার লম্বা দৌড় ওপারের দিকচিহ্নহীনতায়
তারপর সমস্ত শব্দের ঢলে-পড়া ঘুম।".....পূর্ণেন্দু পত্রী

পুরী তে অনেকবার গেছিলাম কিন্তু এবারের যাত্রা র মধ্যে এক অন্যরকম উন্মাদনা ছিল।কারণ একটাই ইতিহাস কে জানা আর রূপম বাবুর সাথে শৈশব কাল কে ফিরে পাওয়া।
মার্চ মাসে আধা বসন্ত কে সঙ্গে করে বেরিয়ে এলাম ভারতবর্ষের বিখ্যাত কয়েকটি শিল্পমণ্ডিত স্থাপনা তথা প্রত্ননিদর্শনের জায়গা।পুরী, কোনার্ক ও ভুবনেশ্বর- এই শহর তিনটি পূর্ব-ভারতীয় ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ নামে পরিচিত।পুরীর জগন্নাথ মন্দির, কোনার্কের সূর্য মন্দির, ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ মন্দির, খণ্ডগিরি, উদয়গিরি, ধউলিগিরি গুম্ফা প্রভৃতি আকর্ষণীয় নিদর্শন।
ট্রেন থেকে নেমে হোটেল এ পৌঁছলাম।পুরীর জগন্নাথ মন্দির দর্শন,সমুদ্র সৈকত এ সময় কাটানো...এসব করেই কেটে গেল 10ই মার্চ।
ওড়িশার আরো নাম রয়েছে—‘কলিঙ্গ’, ‘উৎকল’, ‘উড্রদেশ’। কলিঙ্গ রাজার দেশ বলে এর নাম ‘কলিঙ্গ’।
সাত শতকে ওড়িশা থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে উৎখাত করে হিন্দু ধর্মের প্রসার ঘটে।এরপর হিন্দু রাজারা ৫০০ বছর তাঁদের রাজত্বে ওড়িশাকে দৃষ্টিনন্দন মন্দির দিয়ে সাজান। বারো শতকে এসব মন্দিরের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে যায়।

"ভ্রমণ প্রথমে তোমাকে নির্বাক করে দেবে তারপর তোমাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে। "– ইবনে বতুতা

তাই , ভ্রমণের উদ্দেশ্যে সকাল নটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম সকালের জলখাবার সেরেই।পথে চন্দ্রভাগা সমুদ্র সৈকত ও কোনারক ছিল বলে পৌঁছতে পৌঁছতে একটা বেজে গেছিলো।চন্দ্রভাগা ও কোনারক নিয়ে অন্য একদিন আলোচনা করবো।
উড়িষ্যার অন্যতম প্রধান তীর্থ ভূবনেশ্বর যে পৰ্ব্বতমালায় বেষ্টিত, তাহা হলো উদয়গিরি, খণ্ডগিরি, নীলগিরি ও ধবলগিরি এই চারটি নামে তাদের উল্লেখ করা হয়। এদের মধ্যে উদয়গিরি, খণ্ডগিরি এবং ধবলগিরি নানা প্রকার প্রাচীন তথ্যে পরিপূর্ণ, নীলগিরি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না।
আগের পর্বে উদয়গিরি,খণ্ড গিরি ও ধবলগিরি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছিলাম।শেষ পর্বে লিঙ্গরাজ মন্দির নিয়ে আলোচনা করবো...

পূর্বভারতীয় রাজ্য উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরে অবস্থিত প্রাচীন মন্দির গুলোর মধ্যে অন্যতম।কলিঙ্গ স্থাপত্য শৈলীর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।এই মন্দির নির্মাণের সময় আধুনিক যন্ত্র,প্রযুক্তি কৌশল ও পরিবহণ ব্যবস্থা উন্নত ছিল না। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই বিশাল মন্দির টি কিভাবে নির্মিত হয়েছিল,যার রহস্য এখনও প্রত্নবিদ ও ঐতিহাসিক দের ধাঁধায় ফেলে দেয়। আশ্চর্য হতে হয় যে কি করে এই মন্দিরের এত বড় বড় পাথর তোলা হয়েছে,কিসের মাধ্যমে পাথর তোলা হলো তা নিয়ে আজ ও ভাবতে হয়।মন্দিরটি শিব এবং বিষ্ণুর মিলিত রূপ হরিহরের নামে উৎসর্গীকৃত।
লিঙ্গরাজ মন্দির ভুবনেশ্বরের সব থেকে বড় মন্দির। কেন্দ্রীয় মিনারটি ১৮০ ফুট উঁচু। মন্দিরটি কলিঙ্গ স্থাপত্যকলা এবং মধ্যযুগীয় ভুবনেশ্বর স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত। ধারণা করা হয়ে থাকে মন্দিরটি সোমবংশী রাজত্বকালে নির্মিত যা পরবর্তীতে গঙ্গা শাসকদের হাতে বিকশিত হয়। মন্দিরটি দেউল শৈলীতে নির্মিত যার চারটি ভাগ আছে। সেগুলো হচ্ছে শ্রীমন্দির, জগমোহন, নাটমন্ডপ এবং ভোগমন্ডপ। ভাগগুলোর উচ্চতা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। মন্দির চত্ত্বরটি দেয়ালঘেরা।দেড় হাজার বছরের বেশি প্রাচীন এই মন্দিরের উল্লেখ হিন্দু ধর্মশাস্ত্র ব্রহ্মপুরানেও আছে। কলিঙ্গ শিল্পকলার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে এই মন্দির।
 

এই শতাব্দী প্রাচীন মন্দিরটি গড়ে ওঠার সময় কিন্তু ভুবনেশ্বর নামটাই ছিল না। এই জায়গার নাম ছিলো, একাম্র ক্ষেত্র।অনেকে এই মন্দিরের স্থান টি কে গুপ্তকাশী ও স্বর্ণাঞ্চল ধাম ও বলে থাকে।তেরো শতকে লেখা সংস্কৃত পুঁথি একাম্রা পুরাণ অনুযায়ী লিঙ্গরাজের মন্দিরটি একাম্রা (আম) গাছের নিচে অবস্থিত ছিলো। লিঙ্গরাজ মন্দিরটি মন্দির ট্রাস্ট বোর্ড এবং আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অভ ইন্ডিয়ার অধীনে পরিচালিত হয় বর্তমানে।প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী মন্দিরটি দেখতে আসে এবং উৎসব মৌসুমে লক্ষাধিক ভ্রমণার্থী আসে। এখানকার শিবরাত্রি উৎসব প্রধান অনুষ্ঠান।
 

ইতিহাস:

লিঙ্গরাজ শব্দের আক্ষরিক অর্থ লিঙ্গের রাজা, হিন্দুমতে শিবের প্রতিরূপ। পুরাণে বলে, এখানে এক আম গাছ বা এক আম্র গাছের নীচে পূজিত হতেন ‘হর-হরি’, বিষ্ণু ও শিব একসাথে, এক লিঙ্গে। তাঁরা একসাথে স্বর্গ-মর্ত-পাতালের অধীশ্বর, ত্রিভুবনেশ্বর। সেই থেকেই ভুবনেশ্বর।
👉 আবার অনেকের মতে, আদিতে শিবকে কীর্তিভাসা এবং পরে হরিহর হিসেবে পূজা করা হতো। তাকে ত্রিভুবনেশ্বর (ভুবনেশ্বরও বলা হয়) বলা হয় যার অর্থ স্বর্গ, মর্ত ও শূন্যলোকের অধিপতি। তার সঙ্গিনীকে বলা হয় ভুবনেশ্বরী।
👉 [বিতর্কিত মতামত:
বিষ্ণু বা নারায়ণ পূজিত হন লিঙ্গে না, শিলায়। খটকাটা এখানেই, লিঙ্গম বা শিবের মাথায় উপর বিষ্ণু এলেন কী ভাবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেবেন ঐতিহাসিকেরা। মনে হয় এটা আদতে একটা শিব মন্দির। এর প্রতিষ্ঠা শুরু হয়েছিল সৌম্যবংশী রাজাদের হাতে। তাঁরা ছিলেন শৈব উপাসক। উড়িষ্যায় বর্তমানে যে কটি শিব মন্দির আছে, লিঙ্গরাজ মন্দির তার মধ্যে অন্যতম। মন্দির নির্মাণ শেষ হয়েছিল গঙ্গাবংশীয় রাজাদের হাতে। ততদিনে উড়িষ্যা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বিষ্ণু বা জগন্নাথ দেবের আরাধনা। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের নির্মাণ পর্ব শুরু হয় এই সময়ে। কিছুটা জোর করেই হয়তো শিবের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল বিষ্ণু বা নারায়ণকে।]

👉 এগারো শতকের শেষ দশক থেকে মন্দিরটি টিকে আছে। ষষ্ঠ শতকে মন্দিরটি নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যায় কারণ সপ্তম শতকের কিছু সংস্কৃত পুঁথিতে মন্দিরটির উল্লেখ আছে।প্রত্নবিদ ফার্গুনসনের মতে, মন্দিরটির নির্মাণকাজ শুরু করেন ললাট ইন্দু কেশরী যিনি ৬১৫ থেকে ৬৫৭ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। জমায়েত স্থল জগমোহন এবং মন্দির মিনার এগারো শতকে নির্মিত হয় অন্যদিকে ভোগমন্ডপ বারো শতকে নির্মিত হয়। শালিনীর স্ত্রী ১০৯৯ থেকে ১১০৪ সালের মধ্যে নটমন্দির নির্মাণ । এই অঞ্চলে জগন্নাথ অংশ বাড়তে থাকলে মন্দিরটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয় বলে ধারণা করা হয়। গঙ্গা শাসকেরা বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী ছিলো এবং ১২ শতকে পুরিতে তারা জগন্নাথ মন্দির স্থাপনকরেছিলেন । তবে কিছু মতে মন্দিরটি ১১ শতকের মধ্যে নির্মান করেন সোমবংশী রাজা যযাতি। যযাতি কেশরী তার রাজধানী জাজপুর থেকে ভুবনেশ্বরে সরিয়ে আনে যাকে ব্রাহ্মপুরাণে একাম্রাক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সোমভামসি রাণীদের একজন মন্দিরটিকে একটি গ্রাম দান করেছিলেন এবং মন্দিরের ব্রাহ্মণগণ উপযুক্ত পারিতোষিক পেতেন। একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় দ্বিতীয় রাজাররাজা ১০৯৪ শকাব্দে বা ১১৭২ সালে মন্দিরটিতে স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করেছিলেন (শিলালেখ থেকে পাওয়া)। ১১ শতকে ১ম নরসিংহ দেবতাকে তাম্বুল হিসেবে পান পাতা উৎসর্গ করেছিলেন। মন্দিরের আরেকটি শিলালিপি থেকে জানা যায় যে আশপাশের গ্রামবাসীর জন্য ছোড়াগঙ্গার কাছ থেকে রাজকীয় পারিতোষিক পাওয়ার কথা উল্লেখ আছে।

কে,সি পানিগ্রাহী বলেন যে যযাতির মন্দিরটি নির্মানের কোন সময় ছিলো না। তার পুত্র অনন্ত কেশরী এবং উদ্যত কেশরী এটা নির্মান করেন। তবে এই মতের দ্বিমত হচ্ছে তার দুর্বল উত্তরসূরিদের পক্ষে এরকম চমৎকার এবং নান্দনিক একটি স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব নয়।

স্থাপত্যবিদ্যা :

ভুবনেশ্বরের সব থেকে বড় মন্দির হচ্ছে লিঙ্গরাজ মন্দির। সুপরিচিত সমালোচক এবং ঐতিহাসিক জেমস ফার্গুসন (১৮০৮-৮৬) মন্দিরটিকে ভারতের বিশুদ্ধ হিন্দু মন্দিরসমূহের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।এটা একটি ৫২০ ফু (১৬০ মি) x ৪৬৫ ফু (১৪২ মি) প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত।বহি শত্রু আক্রমণের হাত থেকে রক্ষার জন্য এই প্রাচীর। দেয়ালটি ৭.৫ ফু (২.৩ মি) পুরু। সীমানা প্রাচীরের ভেতরের অংশকে বাইরের আঘাত থেকে রক্ষার জন্য একটা টেরেস রাখা হয়েছে।মিনারটি ৪৫.১১ মি (১৪৮.০ ফু) উঁচু এবং মন্দির সীমানার মধ্যে ১৫০ টি ক্ষুদ্র সমাধী আছে। উঁচু মিনারটির প্রতিটি ইঞ্চি নকশাকৃত। প্রবেশপথের দরজাটি চন্দনকাঠে নির্মিত।
 

👉 লিঙ্গরাজ মন্দিরটি পূর্বমুখী এবং চুনাপাথরে তৈরী। মন্দিরের প্রধান প্রবেশ পথটি পূর্বে হলেও উত্তর ও দক্ষিণে দুটি ছোট প্রবেশপথ আছে। মন্দিরটি দেউল শৈলীতে নির্মিত যার চারটি অংশ আছে। বিমান, জমায়েতের স্থান জগমোহন, উৎসব মিলনায়তন নাটমন্দির এবং উৎসর্গ মিলনায়তন ভোগ মণ্ডপ। চারটি অংশ একই অক্ষে অবস্থিত। সেসময়ে দেবদাসী প্রথার প্রচলন থাকায় নাচের মিলনায়তনটি সংযুক্ত করা হয়। ভোগমন্দির থেকে অনান্য অংশের উচ্চতা বাড়তে বাড়তে বিমানে এসে শেষ হয়েছে।
অনেক ঐতিহাসিকের মতে পুরীর মন্দির অনেকটা এই আদলে তৈরি।

👉 উৎসর্গ মিলনায়তন ভোগমন্ডপের ভেতরের পরিমাপ ৪২ ফু (১৩ মি)*৪২ ফু (১৩ মি), বাইরের পরিমাপ ৫৬.২৫ ফু (১৭.১৫ মি)*৫৬.২৫ ফু (১৭.১৫ মি) এবং প্রত্যেক পাশে একটি করে মোট চারটি দরজা আছে। দেয়ালের বাইরের অংশ মানুষ এবং পশুর কারুকার্যখচিত। মিলনায়তনের ছাদ পিরামিড আকৃতির যেখানে বেশ কিছু আনুভূমিক স্তর রয়েছে। যার ফলে দুটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সেখানে একটি ঘণ্টা এবং একটি কলস আছে।উৎসব মিলনাতনের ভেতরের পরিমাপ ৩৮ ফু (১২ মি)*৩৮ ফু (১২ মি) , বাইরের পরিমাপ ৫০ ফু (১৫ মি)*৫০ ফু (১৫ মি) যার একটি প্রধান প্রবেশপথ এবং দুটি পার্শ্ব প্রবেশপথ আছে। মিলনায়তনের পাশের দেয়ালজুড়ে নারী এবং যুগলদের নকশাকরা। এর ছাদটি মঞ্চের দিকে ঢালু।জমায়েতখানা জগমোহন এর ভেতরের পরিমাপ ৩৫ ফু (১১ মি)*৩০ ফু (৯.১ মি), বাইরে থেকে পরিমাপ ৫৫ ফু (১৭ মি)*৫০ ফু (১৫ মি), দক্ষিণ ও উত্তরে প্রবেশপথ এবং ৩০ মিটার (৯৮ ফু) উঁচু ছাদ। এর ছাদটিও ভোগমন্ডপের ছাদের মত পিরামিডাকৃতির। প্রবেশমুখে একটি সিংহমূর্তি পায়ের উপর ভর দিয়ে বসে আছে।মন্দিরের গাত্রে ইন্দ্র,অগ্নি,যম,বরুন,কুবের,ঈশান, শিববিবাহ, রামায়ণ কথা,মহাভারত কথা,নৃত্যরতা নর্তকী, ও অনেক পশুপাখির মূর্তি অলংকৃত করেছে।

অন্যান্য মন্দির:

শ্রী লিঙ্গরাজ মন্দিরের প্রাঙ্গনে অনেক দেবদেবীদের ছোট বড় মন্দির রয়েছে।শ্রী গনেশ মন্দির,নৃ সিংহ মন্দির,সাবিত্রী মন্দির,বৈদ্যনাথ মন্দির,বিশ্বকর্মা মন্দির,শিবকালী মন্দির,ভুবনেশ্বরী মন্দির,মঙ্গলা মন্দির,পার্বতী মন্দির,বৃষভ মন্দির,যমরাজ মন্দির,কার্তিক মন্দির ইত্যাদি।
👉 বৃষভ হলেন শ্রী লিঙ্গরাজ মহাপ্রভুর বাহন।এই কারণে মহাপ্রভুর সামনে একটি মণ্ডপের উপর প্রস্তর নির্মিত প্রকান্ড বৃষভ মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

উৎসব ও পূজা :

শিবরাত্রি উৎসবের সময়ে ভুবনেশ্বরে লিঙ্গরাজকে গাঁদাফুল উৎসর্গ করা হয়েছে।
হিন্দু কিংবদন্তী অনুসারে একটি ভূগর্ভস্থ নদী লিঙ্গরাজ মন্দিরের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বিন্দুসাগরে এসে পড়েছে এবং বিশ্বাস করা হয়ে থাকে এর পবিত্র জল দৈহিক ও আত্মিক অসুস্থতা দূর করার ক্ষমতা রাখে। পুকুরের জলকে পবিত্রজ্ঞান করা হয় এবং উৎসব মৌসুমে তীর্থযাত্রীরা এই পুকুরে পবিত্রস্নান করে থাকে।মন্দিরের প্রধান দেবতা লিঙ্গরাজকে শিব এবং বিষ্ণু উভয় হিসেবে পূজা করা হয়। হিন্দুধর্মের দুটি ধারা শৈবধর্ম ও বৈষ্ণবধর্মের মিলন ঘটেছে এই মন্দিরে যেখানে বিষ্ণু ও শিবের মিলিত রূপ হরিহরকে পূজা করা হয়।

👉 লিঙ্গরাজ মন্দিরের বাৎসরিক রথযাত্রা রুকুন রথ যাত্রা বা অশোকা অষ্টমী রথযাত্রা।
লিঙ্গরাজ মন্দিরের প্রধান উৎসব হচ্ছে শিবরাত্রি যা চৈত্র মাসে শুক্ল অষ্টমী তিথিতে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় এবং এ সময়ে কয়েক হাজার ভক্ত মন্দির পরিদর্শনে আসে। সারাদিনের উপবাস শেষে এই শুভদিনে লিঙ্গরাজকে বেলপাতা নিবেদন করা হয়। প্রধান উদযাপন হয় রাতে যখন ভক্তদল সারা রাত প্রার্থনা করে। মন্দির চত্ত্বরে মহাদ্বীপ প্রজ্জ্বলনের পরর ভক্তদল তাদের উপবাস ভঙ্গ করে।রুকুণা রথের উচ্চতা ৩৮ ফুট।চার চাকা যুক্ত আর চারটি কাঠের ঘোড়া নির্মিত এই রথ।রথের শীর্ষে দধি নওতী ও কাঠের তৈরি দেবদেবীর মূর্তি থাকে।রথ টি কে ভাঙাচোরা রাস্তায় চালানো হয় বলে খরড়া (একটি বিশেষ স্টিয়ারিং)ব্যবহৃত হয়।রুকুণা রথে যে দড়িটি ব্যবহৃত হয় সেই দড়িটি পুরী তে অনুষ্টিত মাতা সুভদ্রার রথে ব্যবহৃত হয়।এটি একটি প্রাচীন প্রথা।
একটি রথে চড়িয়ে দেবতাকে রামেশ্বর দেউল মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। হাজারো ভক্ত রথকে অনুসরণ করে ও রথ টানে। উজ্জ্বলভাবে সুসজ্জিত রথে লিঙ্গরাজ ও তার বোন রুকমনির মূর্তি থাকে।রথযাত্রা সম্পন্ন হয়ে গেলে আবার পুরীর শ্রী মন্দির এর কার্যালয়ে ফেরত দেওয়া হয়।এই রথযাত্রা পাঁচদিন ধরে চলে।রামেশ্বর মন্দির এ চারদিন থাকার পর শ্রী লিঙ্গরাজ মহাপ্রভু আবার মন্দিরে ফিরেই আসেন।প্রতিবছর শ্রাবণমাসে হাজারো তীর্থযাত্রী মহানদী নামক নদী থেকে পায়ে হেটে জল মন্দিরে বয়ে আনেন।ভাদ্র মাসে সুনিয়ান দিবস পালন করা হয় যেদিন মন্দিরের চাকর, সেবায়েত এবং মন্দিরের জমি গ্রাহকেরা লিঙ্গরাজের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা নিবেদন করে।

👉 চন্দন যাত্রা হচ্ছে ২২ দিনব্যাপী উৎসব যখন মন্দিরের সেবায়েতরা বিন্দুসাগর পুস্করিনী তে বিশেষভাবে নির্মিত দুটি নৌকার উপর ১৪ফুট উঁচু আর ১২ফুট চওড়া মঞ্চে শ্রী লিঙ্গরাজ কে অবস্থান করায়।এই যাত্রায় শ্রী লিঙ্গরাজ মতা পার্বতী কে সঙ্গে নিয়ে যান।দেবতা এবং সেবায়েতগণকে চন্দনবাটা মাখানো হয়। নৃত্য, একসাথে ভোজন ইত্যাদির আয়োজন করে মন্দিরসংশ্লিষ্ট জনগণ।
👉 শ্রী লিঙ্গরাজ মন্দিরে আরো উৎসব পালন করা হয় সেগুলো হলো প্রবরণ(অগ্রহায়ন মাসে),পুষ্পাভিষেক(পৌষ মাসে),মকর সংক্রান্তি,মাঘ সপ্তমী(মাঘ মাসে),শিব চতুর্দশী(ফাল্গুন মাসে)।

👉 ভুবনেশ্বরের অন্যান্য মন্দিরে পূজা অর্চনা নিয়মিত নয় কিন্তু লিঙ্গরাজ মন্দিরে নিয়মিত হয়। মন্দির অভ্যন্তরে অহিন্দুদের প্রবেশাধিকার নেই তবে মন্দিরের বাইরে নির্মিত দর্শনের বেদী থেকে দেখা যায়। দর্শনবেদীটা মন্দিরের পিছন দিকে। মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষার্থে মন্দিরে কুকুর, অস্নাত দর্শনাভিলাষী, ঋতুমতী নারী এবং যাদের পরিবারে ১২ দিনের মধ্যে জন্ম বা মৃত্যু ঘটেছে তাদের প্রবেশ নিষেধ।কোন কারণে অনাহুত প্রবেশ সংঘটিত হলে মন্দির শুদ্ধতার জন্যে বিশেষ আচারবিধি অনুসরণ করে এবং প্রসাদ একটি কূপে ফেলে দেওয়া হয়।

ধর্মীয় আচার :

লিঙ্গরাজের প্রতিকৃতিকে প্রতিদিন কয়েকবার গোছল করানো হয় যাকে বলা হয় মহাস্নান এবং ফুল, চন্দন বাটা ও বস্ত্র দিয়ে সাজানো হয়। অন্যান্য শিব মন্দিরে সাধারণত হেমলক ফুল দিয়ে সাজানো হয়ে থাকে কিন্তু লিঙ্গরাজ মন্দিরে এটা নিষিদ্ধ। দৈনন্দিন পূজায় বিল্বপত্র এবং তুলসী ব্যবহার করা হয়। ভোগমন্ডপে ভাত, তরকারি এবং মিষ্টি প্রদর্শন করা হয় এবং সংস্কৃত মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে সেগুলো গ্রহণের অনুরোধ করা হয়। তীর্থযাত্রীগণ সাধারণত নারকেল, পাকা ফল এবং কোরা খই লিঙ্গরাজের চরণে নিবেদন করে থাকে। ওড়িয়া নববর্ষ পানা সংক্রান্তিতে কিছু কিছু ভক্ত শিব মন্দিরে ভাঙ নিবেদন করে।

👉 লিঙ্গরাজ মন্দির সকাল ৬ টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে। তবে ভোগ প্রদানের সময়ে বন্ধ থাকে। খুব ভোরে লিঙ্গরাজের ঘুম ভাঙাতে প্রকোষ্ঠে বাতি জ্বালানো হয়। স্নান করানো হয় এবং আলোর নাচনের মাধ্যমে আরতি করা হয়। দুপুর বারোটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত মন্দির বন্ধ থাকে। দরজা বন্ধ হওয়ার পরে পঞ্চামৃত তথা দুধ, ঘোল, ঘি, মধু ইত্যাদি মিশিয়ে দেবতাকে মহাস্নান করানো হয়। ১ টার সময়ে একটা পাকা ফল দুই টুকরো করে একটুকরো সূর্যদেবতার উদ্দেশ্যে এবং অন্য টুকরো দ্বারপালের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়। দুপুর ১ টা থেকে দেড়টার মধ্যে দেবতাকে বল্লভ ভোগ দেওয়া হয়। খাবারের একাংশ পার্বতীর মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাকে নিবেদন করা হয়। অর্থোডক্স হিন্দু গৃহবধুরা খাদ্যগ্রহণের এই রীতি পালন করে থাকে। দুপুর দুটোয় সকাল ধুপ (সকালের খাদ্য নিবেদন) অনুষ্ঠিত হয়। লিঙ্গরাজকে খাবার প্রদানের পরে পার্বতীর মন্দিরে যাওয়া হয়। সাড়ে তিনটায় ভান্দা ধুপ অনুষ্ঠিত হয়। পরে খাবারটি মহাপ্রসাদ হিসেবে তীর্থযাত্রীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

লিঙ্গরাজ মন্দিরের পুস্করিনীঃ

বিন্দুসাগর,পাপনাশীনি কুন্ড,নল কুন্ড,গৌরী কুণ্ড, মরিচি কুণ্ড,রাম কুণ্ড, ভীম কুণ্ড,গঙ্গা যমুনা কুণ্ড, কুকুটেস্বর কুণ্ড, কপিলেস্বর কুণ্ড,চিন্তামনিস্বর পুস্করিনী।

বিন্দুসাগরঃ

শ্রী লিঙ্গরাজ মন্দিরের উত্তরদিকে পবিত্র বিন্দুসাগর পুস্করিনী রয়েছে।ভক্তগণ এই পুস্করিনী জলকে পবিত্র মনে করেন।অনেকগুলো নদীর বিন্দু বিন্দু জল দ্বারা এই পুস্করিনীর সৃষ্টি।এই জন্য এর নাম বিন্দুসাগর।এই পুস্করিনী তে লিঙ্গরাজ মহাপ্রভুর চন্দন যাত্রা পালন করা হয়।
লিঙ্গরাজ মন্দির ছাড়া এখানে অন্যান্য দেবদেবীর মন্দির রয়েছে।উত্তরেস্বর মন্দির,পুরবেস্বর মন্দির,যমেস্বর মন্দির,ভীমেস্বর মন্দির।
মন্দির দেখতে দেখতে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো।মন্দির র কারুকার্য দেখে মন মুগ্ধ হয়েগেলো।ভাবতে লাগলাম এত ডিগ্রি ছিল না তখন কার শিল্পীদের।তাও মুগ্ধকরা এত কারুকার্য শিল্প বানালো কি করে।যদি সময় পাই আবার আসবো এখানে।তবে এই মন্দিরের পুরোহিত দের ব্যবহার একদম অভদ্র।গনেশ মন্দিরে এক পুরোহিত রে উল্টোপাল্টা মন্তব্য আমার খুব বাজে লেগেছে।আমার সাথে তর্ক লেগেছিল কিন্তু গিন্নির হস্তক্ষেপে বন্ধ করেছিলাম।
যাই হোক

"মানুষ ভ্রমণ কে নির্বাচন করে না।ভ্রমণ ই সঠিক মানুষ কে নির্বাচন করে।" ........হয়তো তাই।যাক এবার পালা আমাদের।আবার আসবো নতুন কাহিনী নিয়ে।।

পরিচিতি:

Sandip kumar raj chakraborty Adress: kolkata
শেয়ার করুনঃ