Note: Now you can download articles as PDF format
বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য 9564866684 এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন
  • Travel

ভুবনেশ্বরে ঐতিহাসিক গিরিরাজের সন্ধানে(প্রথম পর্ব)

  • সন্দীপ কুমার রাজচক্রবর্তী
  • May 10, 2020
  • 315 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


"পৃথিবী একটা বই আর যারা ভ্রমণ করে না তারা বইটি পড়তে পারে না।" - সেন্ট অগাস্টিন

দুনিয়ার সব বৈচিত্র্য যেন ধারণ করেছে একা ভারত। এক দিকে গভীর অরণ্য, আরেক দিকে তপ্ত মরুভূমি, এক দিকে সমুদ্র আরেক দিকে সুউচ্চ পর্বতমালা, এক দিকে প্রাচীন জীবনধারায় স্থিত জনগোষ্ঠী অন্য দিকে অতি আধুনিক জীবনযাত্রা, এক দিকে সুপ্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সমাহার আরেক দিকে অত্যাধুনিক স্থাপত্য। অজস্র ভাষা ও লিপির বৈচিত্র্যও এর অন্যতম আকর্ষণ। সহস্র বছরের প্রাচীন ইতিহাসসমৃদ্ধ যে ভূ-খণ্ড তার অর্ধ সহস্র অংশই রচনা করেছে অনেক জাতি।

৯ই মার্চ বেড়িয়েপড়েছিলাম পুরীর উদ্দেশ্যে।রাতের সফরের ট্রেন যাত্রা আমার আবার খুব ভালো লাগে।
 
"রেলগাড়িটার লম্বা দৌড় ওপারের দিকচিহ্নহীনতায়
তারপর সমস্ত শব্দের ঢলে-পড়া ঘুম।".....পূর্ণেন্দু পত্রী
 
পুরী তে অনেকবার গেছিলাম কিন্তু এবারের যাত্রা র মধ্যে এক অন্যরকম উন্মাদনা ছিল।কারণ একটাই ইতিহাস কে জানা আর রূপম বাবুর সাথে শৈশব কাল কে ফিরে পাওয়া।
মার্চ মাসে আধা বসন্ত কে সঙ্গে করে বেরিয়ে এলাম ভারতবর্ষের বিখ্যাত কয়েকটি শিল্পমণ্ডিত স্থাপনা তথা প্রত্ননিদর্শনের জায়গা।পুরী, কোনার্ক ও ভুবনেশ্বর- এই শহর তিনটি পূর্ব-ভারতীয় ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ নামে পরিচিত।পুরীর  জগন্নাথ মন্দির, কোনার্কের সূর্য মন্দির, ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ মন্দির, খণ্ডগিরি, উদয়গিরি, ধউলিগিরি গুম্ফা প্রভৃতি আকর্ষণীয় নিদর্শন।
 
ট্রেন থেকে নেমে হোটেল এ পৌঁছলাম।পুরীর জগন্নাথ মন্দির দর্শন,সমুদ্র সৈকত এ সময় কাটানো...এসব করেই কেটে গেল 10ই মার্চ।
ওড়িশার আরো নাম রয়েছে—‘কলিঙ্গ’, ‘উৎকল’, ‘উড্রদেশ’। কলিঙ্গ রাজার দেশ বলে এর নাম ‘কলিঙ্গ’।
সাত শতকে ওড়িশা থেকে বৌদ্ধ ধর্মকে উৎখাত করে হিন্দু ধর্মের প্রসার ঘটে।এরপর হিন্দু রাজারা ৫০০ বছর তাঁদের রাজত্বে ওড়িশাকে দৃষ্টিনন্দন মন্দির দিয়ে সাজান। বারো শতকে এসব মন্দিরের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়ে যায়।
 
"ভ্রমণ প্রথমে তোমাকে নির্বাক করে দেবে তারপর তোমাকে গল্প বলতে বাধ্য করবে। "– ইবনে বতুতা
 
তাই , ভ্রমণের উদ্দেশ্যে সকাল নটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম সকালের জলখাবার সেরেই।পথে  চন্দ্রভাগা সমুদ্র সৈকত ও কোনারক ছিল বলে পৌঁছতে পৌঁছতে একটা বেজে গেছিলো।চন্দ্রভাগা ও কোনারক নিয়ে অন্য একদিন আলোচনা করবো।
উড়িষ্যার অন্যতম প্রধান তীর্থ ভূবনেশ্বর যে পৰ্ব্বতমালায় বেষ্টিত, তাহা হলো উদয়গিরি, খণ্ডগিরি, নীলগিরি ও ধবলগিরি এই চারটি নামে তাদের উল্লেখ করা হয়। এদের  মধ্যে উদয়গিরি, খণ্ডগিরি এবং ধবলগিরি নানা প্রকার প্রাচীন তথ্যে পরিপূর্ণ, নীলগিরি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না।
 
তবে আজ ধবলগিরি,উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি নিয়ে আলোচনা করছি।
ভূবনেশ্বর তীর্থ এককালে খণ্ডগিরি হইতে আরম্ভ করে ধৌলি পৰ্য্যস্ত বিস্তৃত ছিল— “খণ্ডাচলং সমাসাদ্য যত্রাস্তে কুণ্ডলেশ্বরঃ । আসাদ্য বলহা দেবীং বহিরঙ্গেশ্বরাবধি ।” এই বহিরজেশ্বর ধৌলি পৰ্ব্বতেই অবস্থিত বলে কথিত ছিল।সুতরাং ধৌলি এককালে ভূবনেশ্বর তীরে অন্তর্গতই ছিল। কিন্তু ভূবনেশ্বর তীর্থ প্রসিদ্ধলাভ করবার বহু পূৰ্ব্ব হতে ধৌলি যে প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেইছিলো সে-কথা জানা যায়। মহাভারতের বনপর্কে পাগুবদিগের তীর্থযাত্রায় কলিঙ্গ দেশে বৈতরণী পার হয়ে স্বস্তুবন ও সাগরোখিত বিষ্ণুবেদীতে গমনের কথা আছে।
চন্দ্রভাগা সৈকত, কোনারক পেরিয়ে পৌঁছেই গেলাম ভুবনেশ্বর এ।ভুবনেশ্বর এ আস্তে আস্তে কিছু টুকরো ইতিহাস মনে করতে লাগলাম।
ভুবনেশ্বর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরত্বে রাসূলপুরেই দয়া নদীর তীরে অবস্থিত ধবলগিরি বা ধৌলি।এই দয়া নদীর সহিত ভাগবী নদী আসিয়া মিশেছে বলে অনুমান করা হতো।
ধবলগিরি নিখিলনাথ রায় হিমালয়ের তন্ত্ৰ তুষারাবৃত ধবলগিরি শৃঙ্গের কথা অনেকেই অবগত আছেন। কিন্তু আমরা যে ধবলগিরির কথা বলছি, তা উড়িষ্যার একটি নাতু্যচ্চ পৰ্ব্বত। এই ধবলগিরি সাধারণত: ধৌলি পাহাড় নামেই প্রসিদ্ধ। 
প্যাঁচানো অনেক সাদা ধবধবে সিঁড়ি ভেঙে ধৈলী পাহাড়ের শান্তি স্তূপের পাদদেশে এসে অবশেষে পৌঁছলাম।ধৌলি পাহাড়ের চূড়ায় 1972সালে জাপানের বুদ্ধ সঙ্ঘ( কালিঙ্গা নিপন সংঘ) ও ওড়িশার সরকার মিলে তৈরি করে দুগ্ধ ধবল শান্তি স্তুপ যা ধৌলি নামেই পরিচিত।এই মন্দির কে অনেকে "white pagoda" বা ধবলেস্বর মন্দির ও বলা হতো।শান্তি স্তূপ এর পাশেই একটি শিবমন্দির আছে।পারলে এড়িয়ে চলবেন।
এবার আসি ,এই জায়গার টির বিশেষ কি গুরুত্ব ছিল ইতিহাস এ?
মৌর্য সম্রাট অশোকের ছাপ রয়েছে প্রায় সমস্ত ভারতীয় মুদ্রায় । কারন সত্যপুত্র,কেরল পুত্র, পান্ডু রাজ্য,চোল ও চের রাজ্য বাদে সুদূর আফগানিস্তান থেকে গোটা ভারত তার শাসনাধীন ছিল।
২৬৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তৃতীয় মৌর্য্য সম্রাট হিসাবে সম্রাট অশোক মগধের সিংহাসন লাভ করেন ।সিংহাসনের বসার পর থেকে তার নজর চলে আসে কলিঙ্গ রাজ্যের প্রতি।তার পিতামহ ও পিতার কলিঙ্গ জয়ের স্বপ্ন বারংবার ব্যর্থ হয়েছে।এর ফলে তার একরকম জেদ চেপে গেছিলো।২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সম্রাট অশোক কলিঙ্গ আক্রমণ করেছিলেন।
কলিঙ্গ সম্রাট অন্বন্ত পদ্মানাভানের সৈন্যবাহিনী ছিল সম্রাট অশোক র বাহিনীর অর্ধেকের ও কম।ধৌলি পাহাড়ের সংলগ্ন ময়দানে দুই সম্রাট তাদের সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছিলেন।রণকৌশলে অশোকের বাহিনীর কাছে কলিঙ্গের সৈন্যবাহিনী বার বার পরাজিত হচ্ছিল।কিন্তু পরাক্রমশালী কলিঙ্গবাহিনী তাদের পরাজয় মানতেই নারাজ।দু পক্ষের প্রবল লড়াই যুদ্ধক্ষেত্রের ময়দান থেকে পুরো কলিঙ্গ রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল।দয়া নদীর রং ক্রমশ লাল হতে শুরু করে।ধৌলি র ময়দান ক্রমশ লাশের স্তূপ এ পরিণত হয়েছিল।একবছর ব্যাপি এই যুদ্ধ চলায় পুরো কলিঙ্গ রাজ্য লাশের রাজ্যে পরিণত হয়।চিল - শকুনের আনাগোনায় ভর্তি হতে শুরু করে গোটা কলিঙ্গ রাজ্য।সম্রাট অশোকের অনেক সৈন্য বীরগতি লাভ করেছিলেন।ভারতের ইতিহাসের এমন রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম তেমন দেখা যায়নি।যুদ্ধের নৃশংশতা ও কলিঙ্গবাসীর আর্তনাদ অশোকের মন কে আমূল পরিবর্তন করে ধর্মাশোকে পরিণত করেছিল।যুদ্ধের জয়লাভ তার মন কে শান্ত করতে ও পারেনি।
আর যুদ্ধের পর অশোক এখানেই ধ্যানে বসেন।
 
 
 
উপগুপ্তের কাছে দীক্ষালাভ করে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের মাধ্যমেই শান্তির বাণী ছড়িয়েদিয়েছিলো সারা বিশ্বে।কিন্তু কলিঙ্গ বাসী অবশ্য তাকে কোনোদিন ও ক্ষমা করতে পারেন নি যদিও।
এই তো গেল ইতিহাস।ফিরেই আসি আবার শান্তির স্তূপ এ।সাচীর সারোনাথের আদলে স্তূপ টি অনেকটা তৈরি।স্তুপের ভিতরে চারটি বৌদ্ধ মূর্তি বিভিন্ন ভঙ্গিতে দেখতে পাওয়া যায়।তার মধ্যে দুটি শ্বেতপাথরের ধ্যানরত মূর্তি, একটি শ্বেতপাথরের ঘুমন্ত বা শয়নরত মূর্তি এবং একটি কষ্ঠিপাথরের দন্ডায়ামান মূর্তি । এছাড়া এই স্তূপের বাহিরগাত্রে লাগানো পাথরের স্ল্যাবে গৌতম বুদ্ধের জীবনের অনেক কাহিনী বা ঘটনার চিত্রপট খোদিত আছে। আর প্রবেশের সময় চোখে পড়বেই একজোড়া হলুদ সিংহ, চারটি প্রবেশপথে চার জোড়া হলুদ সিংহ দেখতে পাবেন, তারা যেন দয়া নদীর এই উপত্যকার সেই যুদ্ধের বর্ণনা আজ ও খুঁজে যাচ্ছে।শান্তির এই স্থাপনা দেখে নামার সময় চোখে পড়লো ছোটো ছোটো দোকান।রৌদ্রের তপ্ত কিরণ তখন মাথায়।তৃষ্ণা নিবারণের জন্য শসা খেলাম।পরে কামরাঙ্গা মাখা দেখে শৈশব মনে পরে গেল।তাই কামরাঙ্গা মাখাও খেলাম।
পাহাড়ের খাড়াই রাস্তার শুরুর মুখে ক্ষয়প্রাপ্ত টিলার পাশে একটি হস্তী মুর্তির নিচে খোদিত আছে ১৮৩৭ সনে ঐতিহাসিক জেমস প্রিন্সেপ দ্বারা পাঠোদ্ধার করা সম্রাট অশোকের সেই বিখ্যাত শিলালিপি।যার অনুবাদ করা আছে পাশের বোর্ড এ।এই শিলালিপির একটু ইতিহাস দেখা যাক......(পাহাড়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে গুহাগাত্রে অশোকের খোদিত লিপি দেখতে পাওয়া যায়।গিরিলিপি তিনটি সারিতে লিখিত হয়েছে। পৰ্ব্বতের যে-ভাগে অশোক-লিপি খোদিত, তাহাকে অশ্বথামা পৰ্ব্বত বলে বলিয়া "মিষ্টার কিট্র" উল্লেখ করিয়াছেন । এই কিট্রোই প্রথমে ধৌলির অশোক-লিপি আবিষ্কার করেন।তার আত্মজীবনী থেকে জানা যায় যে, তিনি দুই বার ধৌলিতে গমন করেছিলেন, ধৌলি পাহাড়ে তখন ভাল্লুক নামক হিংস্র জন্তু বাস করতো। প্রথমবার তিনি একটি ভল্লুকের শিকার করেন,তার দুটি শাবক ছিল,; দ্বিতীয় বারে তিনি সেই শাবক দুইটিকে বেশ বড় দেখেছিলেন। এখন আর ধোলি পাহাড়ে সেরূপ ভাবে কোন হিংস্ৰ জন্তু বাস করে না।যে-গুহাগাত্রে অশোক-লিপি খোদিত, তাহার মাথা ভেঙে যাওয়ায় এখন থাম দিয়ে ছাদ করিয়া দেওয়া হয়েছে।)
 
মানব সভ্যতার অন্যতম হস্ত শিল্পের নিদর্শন দেখে কিছুক্ষণ প্রতিদিনের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম হঠাৎ জ্ঞান ফেরার পর তার ব্যাখ্যা খুঁজে পেলাম না। সেইরকম আশ্চর্যচকিত করে দেওয়া গুহাগুলি  আমরা দেখতে পাই ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর এর 6 কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত খণ্ডগিরি উদয়গিরি নামক দুটি পাহাড়। ধবলগিরি দেখে ,দেরি না করে বেরিয়ে পড়লাম আবার গাড়িতে উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি দর্শনের উদেশ্যে।ধবলগিরি থেকে উদয়গিরি ও খন্দগিরির দূরত্ব প্রায় ১৫কিলোমিটার।প্রকৃতির সহায়তায় আর মানুষের শিল্পকলার অন্যতম নিদর্শনএই গুহাগুলি।
"কবি জীবনানন্দ দাস লিখেছিলেন, ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা/ মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য’!"
 
 
 
গুহাগুলি উদয়গিরি এবং খণ্ডগিরি নামক পাশাপাশি অবস্থিত দুটি পাহাড়ের গায়ে সজ্জিত, যাদেরকে হাথিগুম্ফা শিলালিপিতে কুমারী পর্বত নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। 
উদয়গিরির শব্দের অর্থ উদীয়মান সূর্য ।এই গুহাগুলি কমপক্ষে 3000 বছর পুরাতন ।খণ্ডগিরি র অর্থ ভেঙেপড়া পর্বত। এই  পর্বত গুলির উচ্চতা কমপক্ষে 34 মিটার ও 18 মিটার।
আবার ফিরে আসি সেই ইতিহাস এ..
সম্রাট অশোক কলিঙ্গ আক্রমণ করেছিলেন।
‌ধবলগিরি নিচে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় 1 লক্ষ কলিঙ্গ সেনা মারা গিয়েছিল।দয়া নদী রক্তের প্রবাহ ও যুদ্ধের নির্মমতা চন্ডশোক অশোক কে ধর্মাশোকে পরিণত করে।বৌদ্ধ ধর্মের মাধ্যমে তিনি শান্তির বার্তা প্রেরণ করলেও বঙ্গবাসী তাকে নিষ্ঠুর, হত্যাকারী হিসেবে বিবেচিত করেছিলেন।চেদিবংশীয় রাজা খারবেলের রাজত্বকালে লুপ্ত কলিঙ্গ কে পুনরুদ্ধার করেছিলেন। খ্রিষ্টপূর্বাব্দ দ্বিতীয় শতকে জৈন ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে কলিঙ্গ কে স্বর্ণযুগে পরিণত করেছিলেন।
‌বৌদ্ধ ও জৈন ভিক্ষুগণ সারাবছর দেশ দেশান্তরে ঘুরে বেড়াতেন ধর্ম প্রচারের জন্য। তাদের কষ্ট নিবারনের জন্য তিনি উদয়গিরি এবং খণ্ডগিরিতে গিরিগুহা নির্মাণ করে সাধনা পিঠে পরিণত করেছিলেন ।প্রতিটি কক্ষে দুজন সন্ন্যাসী থাকতেন।গুহার নিকটে বিভিন্ন জলাশয়ে তাদের নিত্যপ্রয়োজনে ব্যবহৃত হতো।মহামেঘবাহন বংশের তৃতীয় রাজার খারবেলের রাজত্বকালে জৈন ধর্মের প্রসার ঘটে।
‌পরবর্তীকালে এটি  ঘনজঙ্গলের আবরণে আবৃত হয়ে গিয়েছিল কিন্তু ১৮২০ সালে ব্রিটিশ প্রত্নবিদ বা কটকের ইংরেজ কালেক্টর এন্ড্রু স্টারলিং খণ্ডগিরি উদয়গিরি কে পুনরুদ্ধার করেছিলেন ঐতিহাসিক মর্যাদায়।উদয়গিরি খণ্ডগিরি বুঝতে পারবেন যে  আপনারা কলিঙ্গের যুগের ইতিহাসে পৌঁছে গেছেন।
‌এই গুহার শিলালিপি ,চিত্র ও ঐতিহাসিক পটভূমি ফেলে আসা অতীতের স্বর্ণযুগ কে আবার ভাবিয়ে তোলে।
‌উদয়গিরি র গুহাসমূহের তালিকা :
‌রাণীগুম্ফা,বাজাহারাগুম্ফা,ছোট হাতীগুম্ফ,অলকাপুরীগুম্ফা,জয়-বিজয়গুম্ফা,পানাসগুম্ফা,ঠাকুরাণীগুম্ফা,পাতালপুরীগুম্ফা,মঞ্চপুরীগুম্ফা,গণেশগুম্ফা,জাম্বেশভরাগুম্ফা,ব্যাঘ্রগুম্ফা,সর্পগুম্ফা,হাতীগুম্ফা,ধ্যানহারাগুম্ফ,হরিদাসগুম্ফা,জগন্নাথগুম্ফা,রোসাইগুম্ফা
 
 
 
খন্ডগিরির গুহাসমূহের তালিকা :
‌তাতোয়াগুম্ফা - ১,তাতোয়াগুম্ফা - ২,অনন্তগুম্ফা,তেন্তুলিগুম্ফা,খন্ডগিরিগুম্ফা,ধ্যানগুম্ফা,নবমুনীগুম্ফা,রড়ভূজিগুম্ফা,ত্রিশূলগুম্ফা,আম্বিকাগুম্ফা,ললাটেদু:খেশ্বরীগুম্ফা,নামহীন,নামহীন,একাদশীগুম্ফা,নামহীন,নামহীন,নামহীন।
‌**[হাথিগুম্ফা শিলালিপি
‌ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের একটি প্রাচীন শিলালিপি।
‌হাথিগুম্ফ শিলালিপি ভারতের উড়িষ্যা রাজ্যের ভুবনেশ্বর শহরের নিকটবর্তী উদয়গিরি পাহাড়ের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত হাথিগুম্ফা নামক চৌদ্দ নম্বর গুহার দেওয়ালে উত্কীর্ণ একটি প্রাচীন শিলালিপি। এই শিলালিপি মধ্য-পশ্চিম প্রাকৃত ভাষায় ব্রাহ্মী লিপিতে। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে কলিঙ্গ সম্রাট খারবেল কর্তৃক উৎকীর্ণ হয়।
 
 
পাঠোদ্ধারের ইতিহাস
‌১৮২০ খ্রিষ্টাব্দে এ. স্টার্লিং এশিয়াটিক রিসার্চেস নামক পত্রিকায় ও অ্যান অ্যাকাউন্ট, জিওগ্রাফিক্যাল, স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যান্ড হিস্টরিক্যাল অব ওড়িশা অর কটক (ইংরেজি: An Account, Geographical, Statistical and Historical of Orissa or Cuttack) নামক তার গ্রন্থে এই শিলালিপি সম্বন্ধে তথ্য প্রকাশ করেন। জেমস প্রিন্সেপ এই লিপির পাঠোদ্ধার করেন যা ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দে জার্নাল অব দ্য এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলে প্রকাশিত হয়, কিন্তু লিপিতে উল্লিখিত শাসকের নাম ঐর বলায় প্রিন্সেপের পাঠোদ্ধার ত্রুটিযুক্ত হয়। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে এইচ. লক এই লিপির একটি ছাঁচ প্রস্তুত করেন যা বর্তমানে কলকাতা শহরের ভারতীয় সংগ্রহালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে আলেকজান্ডার কানিংহাম কর্পাস ইন্সক্রিপ্টিওনাম ইন্ডিক্যারাম নামক পত্রিকায় এই লিপি প্রকাশ করেন। ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে রাজেন্দ্রলাল মিত্র অ্যান্টিকুইটিজ অব ওড়িশা নামক পত্রিকায় লিপিটির সামান্য পরিবর্তিত পাঠোদ্ধার প্রকাশিত করেন।
‌গুজরাটি পন্ডিত ভগবানলাল ইন্দ্রজী এই শিলালিপির প্রথম সঠিক পাঠোদ্ধার করেন, যা তিনি ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক প্রাচ্যবিদদের কংগ্রেসে উপস্থাপন করেন। ভগবানলাল ইন্দ্রজী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি, লিপিতে উৎকীর্ণ শাসকের নাম খারবেল ঘোষণা করেন।ভগবানলাল ইন্দ্রজীর পাঠোদ্ধারে বেশ কিছু সন্দেহের অবকাশ থাকায় ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথ এই শিলালিপির পাঠোদ্ধারের জন্য কাশীপ্রসাদ জয়সওয়ালকে অনুরোধ করলে তিনি দুই বছর ধরে এই লিপি পাঠোদ্ধার ও সংস্কার করেন।]
উদয়গিরিতে হাতিগুহায় উৎকীর্ণ খারবেলের সপ্তদশ পংক্তি র 'লেখে' র থেকে তার জয়যাত্রা ও জৈন ধর্মের বর্ণনা আছে। তিনি ও তার রানী এই গুহার প্রসারে যথেষ্ট অবদান রয়েছে তা প্রমাণ মেলে তার শিলালিপি থেকে।উদয়গিরির উপর হাতিগুহার দেওয়ালের গায়ে খারবেলের ১৭লাইনের হাতি গুম্ফা লিপি খোদাই করা রয়েছে। লিপিটি প্রাকৃত ভাষায় লেখা।কিছু লিপি ব্রাহ্মী ভাষায় লেখা।এগুলি সব ১৮৮৫ সনে পাঠোদ্ধার করা হয়েছিল।রাজা খারবেলর রাজত্বকালের পর এই গুহাগুলির কোন ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়নি তবে বৌদ্ধ ও জৈন ভিক্ষুগণ উদয়গিরি ও খণ্ডগিরি কে আশ্রয় স্থল হিসেবে ব্যবহৃত করত।উদয়গিরির গণেশ গুহায় নবম শতকে উৎকীর্ণ ভৌম রাজবংশের রাজা শান্তি কর দেবের একটি লিপি পাওয়া যায় ।একাদশ শতকে সোমবংশীয় রাজা উদ্দত্তকেশরীর সময়ে খণ্ডগিরির কয়েকটি গুহায় জৈন তীর্থঙ্কর এর মূর্তি স্থাপন করে, পূজারস্থলে পরিণত করা হয়।গঙ্গা ও গজপতির রাজত্বকালে খণ্ডগিরি জৈন ধর্মের কেন্দ্রস্থল ছিল ।ষোড়শ শতকে খণ্ডগিরির ত্রিশূল গুহায় দিগম্বর মূর্তির সংযোজন হয়। 
খন্দগিরির উপরেই ঋষভ দেবের মন্দির টি অষ্টাদশ শতকের ও পাশনাথের মন্দির টি উনিশ শতকের।এই লিপি হতে রাজা খারবেলের রাজত্বকালের ১৩বছরের ইতিহাস জানা যায়।তথ্য অনুযায়ী ১১৭টি গুহা নির্মাণ করা হয়েছিল খারবেলের রাজত্ব কালে।বর্তমানে ৩৫টি গুহা প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে।উদয়গিরি তে ১৮ টি ও খণ্ডগিরিতে ১৭টি গুহা বর্তমানে দর্শন যোগ্য।খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন ছিল রাণীগুহাটি ।এটি  সবচেয়ে নবীনতম গুহা ছিল এবং এই গুহার দেওয়ালে সেইসময়ের মানুষের জীবনযাত্রার ছবি খোঁদাই করা রয়েছে।
‌অনেকের মতে রানী গুহার ভিতরে প্রতিধ্বনির মাধ্যমে শব্দের অনুনাদ সৃষ্টি হতো। রানী গুহার তিনদিকে বারান্দা অলিন্দ বর্তমান ।কিছু কক্ষ এতটাই ছোট যে দাঁড়ানো অসম্ভব। বলা হয় নাকি ,রানীগুহায় শব্দ বিজ্ঞানের প্রয়োগের নিদর্শন ছিল।গুহার ভেতরে জল দাঁড়াবে না, এত উন্নত জল নিকাশি ব্যবস্থা ছিল সেই সময়ে। বিভিন্ন কক্ষে ধর্মীয় উৎসবের ছবি উৎকীর্ণ রয়েছে।বলা হয় নাকি উদয়গিরির উপরে মাকরা পাথরের একটি দেবায়তনের শুরপাকার নিম্নাংশ ও ভূমি এবং হাতিগুহার  সামনে সংযোগকারী একটি রাস্তার সন্ধান মেলে যা রাজা খারবেলের রাজত্বকালে নির্মিত।
 
 
 
টিকিট :
‌উদয়গিরি এবং খণ্ডগিরি গুহায় প্রবেশমূল্য নিম্নরূপ:
‌ভারত, সার্ক-ভুক্ত ও বিমসটেক-ভুক্ত রাষ্ট্রগুলির অধিবাসীদের জন্য জন প্রতি - ৫.০০ টাকা।
‌অন্যান্য বিদেশি রাষ্ট্রের অধিবাসীদের জন্য জন প্রতি - ১০০.০০ টাকা বা ২ ডলার।
‌১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য - বিনামূল্যে প্রবেশ।
‌সময়সূচী
‌এই জায়গাটি সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পর্যটক/দর্শকদের জন্য খোলা থাকে।
‌ভ্রমণ নিয়ে বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক মার্ক টোয়েন বলেছেন ‘আজ থেকে বিশ বছর পর আপনি এই ভেবে হতাশ হবেন যে,আপনার পক্ষে যা যা করা সম্ভব ছিল তা করতে পারেননি। তাই নিরাপদ আবাস ছেড়ে বেরিয়ে পড়ুন। আবিষ্কারের জন্য যাত্রা করুন,স্বপ্ন দেখুন আর শেষমেশ আবিষ্কার করুন’।
এই কথা ভেবে অবশেষে কিছু স্মৃতি আর নতুন কিছু ভ্রমণ বৃত্তান্ত আপনাদের উপস্থাপনা করবো বলেই, আবিষ্কার করে চলে এলাম।
 
গ্রন্থ সহায়তা :
1. ইন্টারনেট ও নিজের ভ্রমন অভিজ্ঞতা
২.পূর্ণ তীর্থ ভারত
3.Bhargava, Gopal K. (2006), Land and People of Indian States and Union Territories: In 36 Volumes. Orissa, Volume 21, Gyan Publishing House, ISBN 9788178353777
4.Michell, George (1990), The Penguin Guide to the Monuments of India, Volume 1: Buddhist, Jain, Hindu, 1990, Penguin Books, ISBN 014008144
5.Udayagiri and Khandagiri Caves, Bhubaneswar, Khurda, Odisha". Archaeological Survey of India.

পরিচিতি:

Sandip kumar raj chakraborty Adress: kolkata
শেয়ার করুনঃ