Note: Now you can download articles as PDF format
বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য 9564866684 এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন
  • Travel

অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রাম ( দ্বিতীয় পর্ব : কনক দূর্গা মন্দির, চিল্কিগড় )

  • মীর হাকিমুল আলি
  • May 1, 2020
  • 167 বার পড়া হয়েছে
Download PDF

ঝাড়গ্রাম, নবগঠিত এই জেলা জঙ্গলমহলের অধীন অত্যন্ত সুন্দর একটা জায়গা। ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে একটা আলাদা কদরের জায়গা হয়ে উঠেছে। জঙ্গল, নদী, পাহাড়, ঝর্ণা, সুন্দর পথ, মাঠের সবুজ ফসল আর সহজ সরল মানুষের অনাড়ম্বর জীবনযাপন সব মিলিয়ে সুন্দরী ঝাড়গ্রাম যেন জঙ্গল রানী। ঝাড়গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বহু সুন্দর সুন্দর বেড়ানোর জায়গা। তার মধ্যে অন্যতম হল চিল্কিগড়ের ডুলুং নদীর তীরে কনকদূর্গা মন্দির। মন্দির নিয়ে গড়ে উঠেছে বহু গল্পগাথা। নানান রহস্য আর ইতিহাস লুকিয়ে আছে এই কনকদুর্গার মন্দিরের অন্দরে।
 
প্রায় ৫০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যময় এই কনকদুর্গা মন্দির ঝাড়গ্রাম তথা চিল্কিগড়ের প্রধান আকর্ষণ। এই মন্দিরের পূর্বে রয়েছে গভীর অরণ্য আর পশ্চিমে রূপসী সুন্দরী ডুলুং নদী। উড়িষ্যা ও অনার্য মন্দিরশৈলীতে নির্মিত প্রাচীন এই মন্দির প্রকৃতপক্ষে একটি বিষ্ণুমন্দির। ভারতের মন্দিরশৈলী ও উড়িষ্যার স্থাপত্যরীতি ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, এই প্রাচীন ভগ্ন মন্দিরের মাথায় বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র ও ধ্বজ বর্তমান। এই শিল্পরীতি শুধুমাত্র ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণের মন্দিরে দেখা যায়। তবুও এই মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ছিলেন কনকদুর্গা। প্রাচীনকালে কোন এক সময় এই মন্দিরে একটি প্রবল বজ্রপাত হয় যার ফলে মন্দিরটি সম্পূর্ণভাবে সমান দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তার পাশেই নবনির্মিত কনকদুর্গা মন্দির স্থাপিত হয়। এই মন্দিরটিও শতাধিক বছরের পুরানো।
 
 
ইতিহাস বলে, এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা গোপীনাথ সিংহ রায়। তিনি একদিন স্বপ্নাদেশ পেয়ে মায়ের সোনার বিগ্রহ কনকদুর্গাকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঝাড়গ্রামে সুন্দরী নদীর দিক থেকে সুবর্ণরেখার পরেই ডুলুং-এর স্থান। পূর্বে রাজা গোপীনাথ সপরিবারে সুসজ্জিত নৌকাবিহারে ডুলুং নদী দিয়ে চিল্কিগড় প্রাসাদ থেকে মন্দিরে আসতেন এবং কনকদুর্গার আরাধনা করতেন। চিল্কিগড়ের রাজারা কালিকাপুরাণ ও তন্ত্রমতে এই দেবীর আরাধনা করতেন। প্রতি অমাবস্যা তিথিতে এই মায়ের কাছে দেওয়া হত নরবলি। রাজার আদেশে রাজ শত্রু ও বন্দীদের নিয়ে আসা হত এই মায়ের সামনে এবং খাঁড়ার আঘাতে অপরাধের শাস্তি স্বরূপ দেওয়া হত নরবলি। এই মন্দিরে নরবলির ইতিহাস বহু বছর স্থায়ী ছিল। পরবর্তীকালে ইংরেজরা চিল্কিগড় দখল করলে এই নরবলি প্রথা বন্ধ হয়। তবে এখনও নবমীতেই দুর্গার সামনে মোষ বলি দেওয়া হয়। কনকদুর্গা মন্দিরে প্রতিদিনের ভোগে মাছ ও ডিম দেওয়া হয়। রাজতন্ত্রের বিলোপের পর ১৯৬০ সালে এই মন্দির থেকে সোনার বিগ্রহটি চুরি যায়। এরপর প্রায় তিন দশক এই মন্দিরের কোনো বিগ্রহ ছাড়াই মায়ের পূজা আরাধনা চলত। এরপর রাজার বংশধরেরা কনকদূর্গার অনুরূপ একটি অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি এখানে প্রতিষ্ঠা করেন এখনও তিনিই মহাসমারোহে পূজিত হন এই মন্দিরে। দেবী দূর্গা চার হাত বিশিষ্ট এবং অশ্বারোহী। এখনো নাকি নবমীর রাতে দেবী স্বয়ং ভোগ রান্না করেন। খুব ধুমধাম করে দূর্গাপূজা হয়। বহু ভক্তসমাগম ঘটে।
 
 
ঝাড়গ্রামের এই অরণ্যাঞ্চল সাধারণত শাল পলাশের অরণ্যে ঘেরা। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় ডুলুং-এর এপারে কনকদুর্গা মন্দির সংলগ্ন প্রায় ৬৮ একর বনভূমি সম্পূর্ণ ঔষধি গাছ দিয়ে ঘেরা। তাই সমগ্র ভারতের উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা ঔষধি উদ্ভিদ গবেষণার কাজে এই বনভূমিতে আসেন। এই মন্দিরের একটু দূরেই বহু প্রাচীন নাক্সভোম বৃক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। পূর্বে রাজা গোপীনাথের পরবর্তী উত্তরসূরীরা আয়ুর্বেদিক স্বাস্থ্যচর্চায় বিশেষভাবে পারদর্শী ছিলেন। তাই এই রাজারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে এমনকি বিদেশ থেকে ঔষধি উদ্ভিদ সংগ্রহ করে এই ঔষধি বনভূমি তৈরি করেছিলেন। উদ্ভিদ গবেষকদের মতে, প্রায় ৪৩০ টি প্রজাতির ঔষধি উদ্ভিদ এই বনভূমিতে পাওয়া যায়।
 
 
 
মন্দির প্রাঙ্গণ বেশ বড় আর খুব সুন্দর। লাল মোরাম দ্বারা আবৃত। সামনেই শিশুদের জন্য বাগান। তারা হেসে খেলে বেড়াতে পারে সানন্দে। সামনের জঙ্গলের মধ্যে কৃত্তিমভাবে তৈরী ডাইনোসর, হাতি, হরিণ সহ বিভিন্ন বন্য পশুর অবয়ব যা জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা দেয়। মন্দির চত্বরে বহু প্রাচীন গাছের সমারোহ। আর সেই সব গাছে অসংখ্য বাঁদরের বাস। সারাক্ষন বাঁদরের এর দাপাদাপিতে মন্দির প্রাঙ্গণ প্রাণচঞ্চল। তবে সাবধানে ফোন ব্যবহার করতে হয়। ফোন কাড়িয়ে নিতে পারে। খাবার খাওয়ার সময়ও সজাগ থাকতে হয়। নয়তো হাত থেকেই খাবার ফুড়ুৎ হয়ে যেতে পারে নিমেষে। তবে বিস্কুট কিনে ওদের খেতে দেওয়াটাও মানবিকতার মধ্যে পড়ে।
 
 
আমরা বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে মন্দিরের পাশ দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে চলার পথ ধরে অনেক হেঁটে হেঁটে মাঠের দিকে বেরোলামণ তারপর কিছুটা গিয়ে আবার নদী পেরিয়ে ওপাড়ে গিয়ে গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম চিল্কিগড় রাজবাড়ীর উদ্দেশ্যে। পরের দিন সেই গল্প শোনাব। কলকাতা থেকে চিল্কিগড়ের দূরত্ব ১৮২ কিমি এবং ঝাড়গ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে এ দূরত্ব মাত্র ১৫ কিমি। ঘন শাল-পিয়ালের অরণ্যে ঘেরা চিল্কিগড় পর্যটকদের কাছে একটি আদর্শ ডেস্টিনেশন। বিশেষ অনুরোধ প্লাস্টিক ফেলে এসব জায়গার সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না।
 
প্রথম পর্ব পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন

পরিচিতি:

মীর হাকিমুল আলি পেশায় একজন গৃহশিক্ষক এবং একটি বিদ্যালয়ের আংশিক সময়ের শিক্ষক (ভূগোল)। বিভিন্ন জায়গা সম্পর্কে জানা, সেখানকার মানুষদের পোশাক, বাড়িঘর কেমন, ভাষা, উৎসব, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছোটো থেকেই তাই ভূগোল বিষয় নিয়ে পড়ার একটা আলাদা আগ্রহ তৈরী হয়l স্কুল জীবনে কাছাকাছি ঘুরতে গেলেও কলেজ এক্সকারসন থেকেই তার ভ্রমণ একটি নেশায় পরিণত হয়l তারপর একটু একটু করে তা বাড়তে থাকেl বর্তমানে তার বয়স ২৬ ইতিমধ্যে ভারতের কয়েকটা রাজ্যের কিয়দংশ ঘুরে ফেলেছেন তিনিl সেগুলি হলো পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কেরল ইত্যাদিl তবে গোটা ভারতসহ পৃথিবীর বহু দেশ ঘোরার ইচ্ছা তার বরাবরেরl ঘোরার পাশাপাশি ছবি তুলতেও আগ্রহী লেখক।
শেয়ার করুনঃ