Note: Now you can download articles as PDF format
বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য 9564866684 এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন
  • Probondho

যন্ত্রণা থেকে বিস্ময়,প্রত্যহ থেকে মহাকাল

  • তৈমুর খান
  • April 22, 2020
  • 208 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


খুব সহজ একটি জীবন ।মাটির কাছাকাছি। হাড়হাভাতের কাছাকাছি। দুঃখ দহনের ,মৃত্যু ও বাঁচার ,রাজনীতি ও মিছিলের, জাগরণ ও ঘুমের, স্বপ্ন ও বিচ্যুতির, সামাজিক ও অসামাজিকের ভেতর দিয়ে চলে যেতে দেখেছি। সময় যাপনের মুহূর্তগুলি থেকে যে স্পন্দন তিনি শব্দে শব্দে তুলে নিয়েছেন তা সময়ের ইতিহাস হয়েও আত্মদ্রবণের গূঢ় সংকেত। আশ্রয় খোঁজা ,প্রেম খোঁজা, মানুষ খোঁজার নিরন্তর প্রক্রিয়া। জৈব-ক্রিয়ার সঙ্গে মনন-ধর্মের উত্তাপ পাওয়া শরীরের রাগ-বৈরাগ্য চিনে নেওয়া। কাম ও প্রেমের মহিমা অনুধাবন করা, আবার অপত্য-স্বাদের গ্রন্থিলগ্নে সামাজিক কর্তব্যে চৈতন্যের জাগরণ উপলব্ধি করা। সবকিছুরই মানব-ইতিহাস তথা জীবন-ইতিহাসকে এভাবেই গোচরীভূত করার অনবদ্য শব্দ-বাঁশির ব্যঞ্জনায়  পংক্তি সাজানোর চক্রটি সম্পন্ন করেছেন। তিনি সেই কবি যাঁর যন্ত্রণা থেকে বিস্ময়, প্রত্যহ থেকে মহাকাল ,জীবন থেকে মহাজীবনের প্রজ্ঞা অবধারিত হয়ে ওঠে কবিতায়।

      কবি অসিকার রহমানের কথাই এতক্ষণ ধরে বলছি। বীরভূমের চন্ডীদাস নানুর এলাকার দিঘীরপাড়া গ্রামে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে জন্ম। শিক্ষক ও কবি হিসেবেই তাঁর পরিচিতি। বহু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'স্বর্ণবিতরণ'প্রকাশিত হয় ১৯৮৯-এ। আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল :  ভিতরে স্বয়ংবর ,বারুদ-বাসর, প্রেমের কবিতা, রমণী-বিদ্ধ, তুলির দাঙ্গা, ইরণ হওয়া, সেই লোকটা, সহর্ষ-মরণ, হরিণী খুরের আগুন ,মৌনী শূন্যতায়, নির্বাচিত কবিতা প্রভৃতি। কবিতার নির্মিতি ক্ষেত্রে কবির মুনশিয়ানা অবাক করার মতো। ছন্দ সচেতনা, কবির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অলংকার প্রয়োগ  কাব্যের ওজস্বীগুণ বৃদ্ধি করেছে। ধ্বনিঝংকারের মাধুর্য পাঠকের উপলব্ধিকে মোহাবিষ্ট করে। তেমনি চিত্রকল্পের সৃষ্টি, বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার সংমিশ্রণ এবং ইতিহাস ও সময়ের  অনুজ্ঞায় ব্যক্তি চৈতন্যের নৈর্বক্তিক প্রজ্ঞার শাশ্বত আবেদন  মর্মছায়া হয়ে ফুটে ওঠে । যাকে কবি বলেছেন : "এখন কবিতার রীতিনীতির যে  অরক্ষণীয় রূপ তার বেগবত্তা বুঝে নিতে নিজস্ব জীবনযাপনের দুর্বিষহ বিপন্নতার জ্বলনকে মিশিয়ে নিতে হবে।" ব্যক্তিজীবনের এই জ্বলন পাঠকের কাছে নৈর্বক্তিক হয়ে ব্যাপ্তির আকাশ রচনা  করে। অসিকার রহমানের কবিতা পাঠ করতে গেলে জীবনের বেগবত্তাকেও অনুধাবন করতে হবে। কারণ যা আবেগ থেকেই  আসে :

বেগ।

আমরা জানি :We must act out passion before we can feel it. অর্থাৎ অনুভূতি অনুভব করার আগে আমাদের অবশ্যই আবেগের সাথে অভিনয় করতে হবে। জাঁ পল সাত্রে(Jean-Paul Sartre)এর এই কথা অমোঘ সত্য হয়ে আছে। বহুদিন আগেই টি এস এলিয়টও আমাদের সতর্ক করে দিয়ে এর গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন : It is obvious that we can no more explain a passion to a person who has never experienced it than we can explain light to the blind. অর্থাৎ এটা সুস্পষ্ট যে আমরা অন্ধকে আলো বোঝানোর চেয়ে যে কোনও ব্যক্তি এর আগে কখনও অনুভব করেনি তার প্রতি আবেগের ব্যাখ্যা আর দিতে পারি না।  এই পথেই হেঁটেছেন অসিকার রহমানও। একেবারে প্রথম দিকের কবিতাতেই উত্তরাধিকার বোধের  সঞ্চার এবং জীবনের প্রবাহ কীভাবে প্রবাহিত হচ্ছে তা দার্শনিকের মতোই উপলব্ধি করেছেন :

"খুব ধীর মন্থর গতিতে যাও জলের ধারে

 দ্যাখো, মুখ দেখা যায় নিজের কোনো পুরুষ

 নিজের মাঝেও নিজে ঘর বেঁধে যায় একবারই ।"

                                                      (পরীক্ষা)

 আবহমান পুরুষ বোধ আত্মরতির সীমানায় তার বিস্তৃতির পর্যবেক্ষণটি প্রবৃত্তির আলোয় তুলে ধরেছেন। আর একটি কবিতায় লিখেছেন:

"আঁধারে ফুলফোটে

 নিয়ত কাঁপে সময়ের ব্যবধান

দেহ থেকে অন্য দেহে সময়ের শৃঙ্খলে।"

                              ( সময়ের শৃঙ্খলে)

 এ তো সৃষ্টির ফুল ,যৌবনের লালিত বাগানে কন্দর্পের পুষ্পবাণ ছুটে যায়। দেহ থেকে দেহে। সময়ের ব্যবধান ঘটলেও বংশগতির আবেগ কখনো থেমে যায় না। জীবনধারার এই পর্যায় থেকেই কবিতার স্বয়ংক্রিয় বিবাচনটি তিনি আমাদের বোধিগোচর করান। মানবজীবনের প্রবৃত্তি যে আদিমতার ভেতর দিয়ে এক অন্ধকার প্রভাষাকেই লালন করে তা কবিও জানেন। জীবনের যত গল্প ও না-গল্প তৈরি হয় সবই এই  প্রবৃত্তির অনুজ্ঞা  থেকে।  'পৃথিবীর পুরোনো কথা' তো তাই-ই। সভ্যতা যতই অগ্রসর হোক 'অতীতের সভ্যতার সুগন্ধে মদির আকাশ' মাথার ওপর জেগে থাকে। ট্রাম থেকে ট্রেন,নৌকা থেকে প্লেন, নগ্নতা থেকে পোশাক পরিধান সবই পরিবর্তিত হয়ে আসে। কিন্তু জীবনের সেই দীর্ঘপথ পরিণতির বার্তা পায় একইরকমভাবে :

 "অতীতের সভ্যতা লুফে নিয়ে রাস্তায়

 ঘুরে ঘুরে ফেরী করা দ্বিধাহীন সস্তায়

 ইঙ্গিতে আভাসে

অবশেষে নির্জনে সোজাসুজি বনবাসে।"

                                (নির্জন বনবাসে)

 এই নির্জনতাই কাম্য হয়ে ওঠে। সমস্ত কোলাহল স্তব্ধ হতে চায় ।  নিজের কাছেই ফিরে আসতে হয় নিজেকে নিজেরই মুখোমুখি। এই দার্শনিক আয়নাখানিই জীবনের প্রাপ্তি। নিজের মধ্যে তখন বহু 'আমি'র যাতায়াত ঘটে। ব্যক্তিকে সর্বনামে তখন  নৈর্ব্যক্তিক হতে  দেখা যায়। যুগের দাবির কাছে ,জীবনের দাবির কাছে যে ইতিহাস ব্যক্তি ফেলে আসে, সেই ইতিহাসপর্ব বর্তমানকেও অতিক্রম করতে হয়। কালপর্ব ব্যক্তি-পর্বের যাতনা থেকেই সার্বিক অমোঘ সত্যটিকেই কবিতায় বারবার নির্দেশ করেন কবি।

       প্রেমেরই স্ফুরণকেও  সার্বিক ও শাশ্বত মনে হয়। তাই সর্বনাম ও নারী, প্রেমিকা ও পৃথিবী একই সমান্তরালে উঠে আসে । জীবনের মাধুর্য ও স্বপ্নচারিতার অনবদ্য ও অনন্ত অন্তিম নিবেদনে :

"তুমি এই পৃথিবী

 নারীর মতো।"( এই পৃথিবী)

 সেক্সপিয়র বলেছেন :I was adored once too. অর্থাৎ আমারও একবার আদর হয়েছিল। এই আদর তো   ভালবাসার ,প্রকৃতির ,আবহমান মানবীয় প্রবৃত্তির। কবি অসিকারও প্রকৃতির এই অনুপম শোভার দৈহিক আকর্ষণে সহজিয়া কুসুমের সুগন্ধ পান। নারী-শরীর তখন ফুলের বাগান। নিঃশ্বাস কম্পন ছন্দ ও লয়ের মহিমায় কবির কাছে উপলব্ধির মাত্রা নির্ণয়ের অক্ষর হয়ে ওঠে। কবি তখন লিখতে পারেন :

"হাতের মুঠোয় পেয়েও তাকে ভাঙব নাকো

 রাতের মাধুরীটুকু লেপটে থাকুক অঙ্গে তারই

 এই রাতে ।"

                                              (ফুলের জ্বালা)

 আদর পেতে পেতে আদর দিতে দিতে ফুলের বাগান লুকোচুরিতে ভরে গেছে। কিন্তু পুরুষ হৃদয়ের সেই শাশ্বত তৃষ্ণা মেটেনি। মরুভূমির মতো ,শাশ্বত প্রেমিকের মতোই তিনি আদি মানব হয়ে আদি মানবী হবার খোঁজ করেছেন।

 অসিকার যে প্রেমের কবি ,মানুষ কবি, বিশ্বাসের কবি, মুখোসহীন  ফুলের হাসি নিয়ে তিনি বিরাজ করতে চান তা বারবার বুঝিয়ে দিয়েছেন :

 "অসময়ে দুর্যোগের দিনে

আমরা সবাই হয়ে উঠি

প্রেমিক,কবি আর প্রকৃত মানুষ ।"

                         (প্রেমিক, কবি)

  অর্থাৎ

 প্রেমিক= কবি= মানুষ

 তিনটি শব্দে কোনো তফাত নেই । কার্পণ্যও নেই। জীবনের মহিমায় তারই সংরাগ প্রতিধ্বনিত হয়েছে। যদিও 'আমরা কেউ ভালো নেই' বলে কবি জানিয়েছেন, কিন্তু এই ভালো না থাকার কারণ যে শুধু আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়া তা নয়। এক  শূন্যতার কাছে আমাদের নিরন্তর অগ্রসর হওয়া। 'চাওয়া-পাওয়া' কবিতায় কবির প্রশ্ন :

"কী চাই ? আমরা কী চাই ?"

 এর উত্তর কবিও পাননি ।হয়তো ভালোবাসা পাওয়ার কথাই ভেবেছেন। কিন্তু ভালোবাসা কী, কেমন করে তাকে পাওয়া যায় তা জানেন না। আবার যাকে ভালোবাসা মনে হয়েছে তা পেয়েও শূন্যতা পূরণ হয়নি। যদিও শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণেই তাঁর ক্লান্তি এসেছে। অন্ধকারেই বনলতা সেনের মতো তার মুখোমুখি পরিসমাপ্তি ঘটেছে। বৈষ্ণব সাহিত্যের মতো মিস্টিসিজমেই কবির পরিপূর্তিলাভ হয়েছে।

          ছোট থেকে বড় সব কাব্যগুলির সবরকম কবিতাতেই কবি নিজেকে বাস্তবের নির্মম পরিহাস থেকে সৌম্য সৌন্দর্যের মর্মলোকে পৌঁছে দিয়েছেন। 'শরীর' বারবার এসেছে প্রেমের স্পর্শ ও অনুভূতি নিয়ে। মাদকতার আশ্লেষে  কাছে টেনেছে। পৌরাণিক মিথের আড়ালে নিজেকে দেখেছেন । কৃষ্ণ হয়ে কখনো বস্ত্র যুগিয়েছেন ,কখনো বাঁশি বাজিয়ে রতিলীলার কন্দর্পপর্ব যাপন করেছেন। নারীকে নামে ডেকেছেন আবার সর্বনামেও। রমণী-বিদ্ধ হয়েছেন, ইরণ হাওয়ায় সর্বনামের গোপন সংকেত পেয়েছেন। অগ্নি-ফাগুনে হৃদয় ঝলসে উঠেছে। তবুও কোকিলের ডাকও ব্যাকুল করেছে। আলতার উচাটন মগ্ন জ্বালায় ক্ষরণের প্রস্রবণে ভাসিয়েছে। মৌনী শূন্যতায় আশ্রিত হয়েছেন। এক শেকড়ের কাছে, এক শিখরের ছায়ায়, কবি প্রেমে ও  মহিমায়, মৃত্যুর ওপারে জীবনের অনন্ত দ্রাঘিমাকে পেয়েছেন বলেই  প্রেমিক হয়ে অনন্ত অভিসারে যাত্রা করেছেন। বলতে পেরেছেন :

 'ও প্রেম, সময়-চূড়া টপকে দাও

                           মৌন সম্মতি।'

পরিচিতি:

জন্ম ২৮ জানুয়ারি ১৯৬৭, বীরভূম জেলার রামপুরহাট ব্লকের পানিসাইল গ্রামে।

পিতা ও মাতা :জিকির খান ও নাওরাতুন।

পড়াশোনা :বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি এবং প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা নিয়ে পি এইচ ডি প্রাপ্তি।

পেশা : উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহ শিক্ষক ।

প্রকাশিত কাব্য : কোথায় পা রাখি (১৯৯৪), বৃষ্টিতরু (১৯৯৯), খা শূন্য আমাকে খা (২০০৩), আয়নার ভেতর তু যন্ত্রণা (২০০৪), বিষাদের লেখা কবিতা (২০০৪), একটা সাপ আর কুয়াশার সংলাপ (২০০৭), জ্বরের তাঁবুর নীচে বসন্তের ডাকঘর (২০০৮), প্রত্নচরিত (২০১১), নির্বাচিত কবিতা (২০১৬), জ্যোৎস্নায় সারারাত খেলে হিরণ্য মাছেরা (২০১৭) ইত্যাদি।

পুরস্কার : কবিরুল ইসলাম স্মৃতি পুরস্কার ও দৌড় সাহিত্য সম্মান, নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার, কবি আলোক সরকার স্মারক পুরস্কার ইত্যাদি ।

ঠিকানা : রামরামপুর (শান্তিপাড়া), রামপুরহাট, বীরভূম, পিন ৭৩১২২৪, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। ফোন ৯৩৩২৯৯১২৫০

শেয়ার করুনঃ