Note: Now you can download articles as PDF format
  • Short Story

ঝড়

  • ড.দেবানী লাহা(মল্লিক)
  • June 28, 2020
  • 50 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


আজ সন্ধ্যে থেকে বাইরে অবিশ্রাম বৃষ্টি পড়ছে সঙ্গে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া।শোঁ শোঁ আওয়াজে বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে বহ্নির।কারেন্ট চলে গেছে।এই ঝড় বৃষ্টিতে আরও কতজনের ক্ষতি হবে কে জানে!এই সাঙ্ঘাতিক পরিস্থিতির চাপ আর নেওয়া যাচ্ছে না।একটার পর একটা বিপর্যয়।মাথাটা হয়তো পাগল হয়ে যাবে ওর।মাকে নিয়ে একা থাকে বহ্নি।তাই সবসময় একটা আতঙ্ক গ্রাস করছে ওকে।এই পরিস্থিতিতে ঘরে বসেই সে অফিসের কাজ করছে অন্যদের মতো।কদিন হল চাকরি পেয়েছে।তবে মাইনে তেমন না।অথচ কাজের খুব চাপ।তবু এখন আর কিছু উপায় নেই।এই চাকরিই করতে হবে ওকে।কিন্তু এইরকম ঝড় বৃষ্টি চললে হয়তো এই কাজটুকুও বন্ধ হয়ে যাবে।নেটের অবস্থা খুব খারাপ এখনই।এইসব সাতপাঁচ ভাবতে-ভাবতে মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেল ওর।রাত বাড়তেই বৃষ্টি আর ঝড়ের বেগ আরো বাড়ল।রাতের দিকে আজকাল রোজই বহ্নির বুকটা জ্বালা করে।পেটের বাঁদিকে একটা ব্যথা হয়। দীর্ঘদিন একভাবে ঘরে বসে থেকে-থেকে মানসিক অবসাদের শিকার হচ্ছে না তো ক্রমে?

ঘরে মোমবাতি ছিল না।তাই ঘরের কোণে বহ্নির মা একটা প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছে।আজকাল বহ্নির অন্ধকার ঘরে কেমন ভয় করে।একটা সময় ঘর একেবারে অন্ধকার না হলে ওর ঘুম আসতো না।আর এখন এইরকম নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে কেমন দম বন্ধ লাগে।তাই জিরো পাওয়ারের একটা টিমটিমে আলো জ্বালিয়ে শোয় ও।কিন্তু আজ তো কারেন্ট নেই।মা জানে মেয়েটা ভয় পায়, তাই প্রদীপটা জ্বালিয়ে দিয়েছে পিলসুজের ওপর।জানলা দরজা বন্ধ।বন্ধ ঘরের আলো-আঁধারীতে প্রদীপের আলো এক অদ্ভুত রহস্যময়তা এনে দিয়েছে।জলের শব্দ শুনতে-শুনতে ঠান্ডা আবহাওয়ায় মনটা কেমন উদাস হয়ে গেছে আজ বহ্নির।কি একটা বিষাদ মেঘ এসে আচ্ছন্ন করে দিয়েছে তার মনের আকাশটা।সারাদিনের ক্লান্তিতে মা ঘুমিয়ে পড়েছে।কিন্তু ওর চোখে ঘুম নেই।রোজই মনে হয় এই অখন্ড রাত হয়তো আর কাটবে না।

ছোট থেকেই লড়াই করছে বহ্নি।একটার পর একটা ঝড় বয়ে গেছে।কিছুতেই স্বস্তি মেলেনি।সেই কবে বাবা চলে গেছে সেকথা আর মনে নেই।মা টিউশানি,সেলাই,হাতের কাজ করে ওকে মানুষ করেছে।তাই জ্ঞান হতেই ও বুঝেছিল জীবনটা বড় কঠিন।ওকে খুব তাড়াতাড়ি নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।নিজেরটা তো করে নিতেই হবে-সেইসঙ্গে মায়ের দুঃখও দূর করতে হবে ওকে।কিন্তু ওদের মতো সামাজিক পরিকাঠামোর মানুষের জীবনে দুঃখ পিছন ছাড়ে না।শোভনের সাথে আলাপ হলো যখন তখন শোভনের চাকরি নেই।বহ্নিও সবেমাত্র পাশ করেছে। সে এক দুশ্চিন্তা শুরু হল।সেজন্য প্রথমটা শোভনের প্রস্তাবে রাজি হচ্ছিল না ও।শোভন চাকরি পেলো তো শুরু হল লকডাউন।উফফ!বহ্নি আর পারছে না।

আজ তিনমাস হল শোভনের সাথে বহ্নির দেখা হয়নি।শোভন গেছে তার নতুন চাকরিতে জয়েন করতে।এতদিন কখনও শোভনকে ছেড়ে থাকেনি ও।বহ্নির মা বলেছিল রেজিস্ট্রিটা করে নিতে কিন্তু শোভন রাজি হয়নি।শোভনের মায়ের বহ্নিকে পছন্দ নয়।একমাত্র ছেলের জন্য অনেক বেশী সুন্দরী বড়লোক বৌ চান তিনি।একবার শোভন ওর বাড়ী নিয়ে গেছিল বহ্নিকে।ওদের পাশের পাড়াতেই শোভনদের বাড়ী।কিন্তু শোভনের মা ভাল করে কথা বলেননি ওর সাথে।ওর স্পষ্ট মনে আছে।খুব কষ্ট পেয়েছিল ও। শোভনের মা বলেছিল-

''হাঘরে ঘরের মেয়ে একটা!''

তাই শোভন বাইরে যাওয়ার আগে আর নতুন করে অশান্তি চায়নি।তাই আর রেজিস্ট্রি টা হয়নি।

শোভন যে জায়গায় রয়েছে সেখানে ফোনের টাওয়ার থাকে না।পাহাড়ী এলাকা।যোগাযোগ করা খুব কষ্টসাধ্য।অনেক রাতে কাজ থেকে ফেরবার পথে একবার করে বহ্নির সাথে ফোনে কথা হয়।আজ সাতদিন হল সেটুকু খবরও পায়নি ও।মনের ভেতর অস্বাভাবিক একটা দুশ্চিন্তা ঘুরে বেড়াচ্ছে ওর।তার ভেতর আজ থেকে এই প্রবল দুর্যোগ শুরু হল।খবরে বলেছে এখন তিনদিন নাকি এইরকম সাঙ্ঘাতিক আবহাওয়া চলবে।বহ্নিদের বাড়ীর কাছেই রেলস্টেশান।কিন্তু আজ কতদিন সমস্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ।পরিচিত পরিবেশ,পরিচিত শব্দগুলো ছাড়া জীবনটা যে এমন দুর্বিষহ হতে পারে তা এই পরিস্থিতি না হলে বুঝতে পারতো না ও।রাতে ট্রেনের শব্দ না শুনতে পেয়ে কি একটা শূন্যতা গ্রাস করে যেন ওকে।এই কদিন হল মাঝে-মাঝে দু একটা মেল ট্রেনের শব্দ শুনেছে বহ্নি।

লকডাউনের জন্য সকলেই গৃহবন্দী।সবকিছু স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শোভন ইচ্ছে করলেও আসতে পারবে না।এই দুর্যোগে মানুষটা কেমন আছে কি করছে ভাবতে-ভাবতে চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে বহ্নির।ফোনটা খুলে শোভনের ছবিগুলো দেখতে থাকে ও।মাঝে- মাঝে মনে হয় যদি একবার ফোনটা বেজে ওঠে।নিজেও এই কদিন কতবার ফোনে ওর নম্বরটা ডায়াল করেছে।কিন্তু পরিষেবা সীমার বাইরে নেটওয়ার্ক।মনকে নানাভাবে প্রবোধ দেয় ও।যাওয়ার আগে শোভন কত হাসাহাসি করে গেছে।আনন্দ করে থাকতে ভালবাসে শোভন।বহ্নিকে একটুও মন খারাপ করে থাকতে দেয়না।হাজার দুঃখ কষ্ট কেমন এক লহমায় দূর করে দেয় শোভন।এ একটা আশ্চর্য ক্ষমতা ওর।শোভনের সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো খুঁজে বেড়ায় ও সারাক্ষণ।অনেক যন্ত্রণার মাঝে শোভনই ওর একমুঠো আকাশ।একরাশ মুক্তি আর ভালবাসা।এইসব ভেবে মনের ভেতরটা জ্বলতে থাকে।এমন যন্ত্রণা যেন ওর অতি বড় শত্রুও না পায়।

''এইবার পাহাড়ে গিয়ে একটা পাহাড়ী মেয়ের সাথে প্রেম করব জানো বহ্নি।পাহাড়ী মেয়েরা খুব সরল আর পরিশ্রমী।পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে ফোনের কভার পিকচার দেবো।ভাল- ভাল ক্যাপশান দেবো।ভাবতেই কি ভালো লাগছে আমার।তুমি দেখবে কমেন্ট করবে।আমরা বেড়াতে যাব তোমাকে নিয়ে,তুমি ছবি তুলে দেবে।''

মুখে কেমন বিশেষ ভঙ্গী করে করে কথাগুলো বলেছিল শোভন। এই কথা শুনে বহ্নি খুব রেগে গেছিল।অভিমানে কান্নাকাটি,খাওয়া বন্ধ কত কি।সে সব মনে পড়ছে খুব আজ।এমন কতরকমভাবে শোভন ওকে রাগাতো।বহ্নিকে রাগাতে বড় ভালবাসে শোভন।

''আচ্ছা পাহাড়ী মেয়ের কথা কেন বলেছিল শোভন?তাহলে কি অন্য কারো প্রেমে পড়ল নাকি সত্যি সত্যি?যদি আমাকে ভুলে যায়?যদি আমাকে আর ভাল না বাসে?সেজন্যই কি আজ সাতদিন খবর নেই কোনো?''

ভাবতে-ভাবতে এই বৃষ্টিমুখর ঝোড়ো রাতেও কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমে উঠল ওর।এ পাশ ওপাশ করতে লাগল ও।মা নিঃসাড়ে ঘুমাচ্ছে।সারাদিন মায়ের প্রচুর পরিশ্রম হয়।বহ্নির প্রাইভেট কোম্পানী।কাজের বড় চাপ।মাকে তেমন সাহায্য করতে পারেনা।কাজের লোক রাখার মতো বিলাসিতা করলে ওদের চলবে না।বহ্নির ইচ্ছে হল মাকে জড়িয়ে ধরে শোবে।কিন্তু মা যদি উঠে পড়ে এই ভেবে চুপ করে খাটের একপাশে পড়ে রইল ও।

বাড়ীর নীচে একটা বাচ্চা কাঁদছে একটানা।মনের ভেতর হু হু করছে ওর।আহা! কার বাচ্চা।দিকে দিকে মানুষের এত কষ্ট আর সহ্য করতে পারছে না ও।একমনে বলতে থাকে বহ্নি-

''শোভন এখন নিরাপদে আছে তো?ঠাকুর তুমি ওকে ভালো রেখো!''

মনে-মনে বহ্নি ভাবে আজ থেকে অনেক বছর আগে যখন সত্যিই বিদ্যুত ছিলনা,ছিলনা যোগাযোগের উপায় তখন এমন প্রদীপের আলোয় হয়তো কত বহ্নি গভীর অপেক্ষার আগুনে পুড়েছে!হয়তো সেই অপেক্ষার ভেতরই তাদের ভালবাসা বেঁচেছে।পুড়ে পুড়েই তো ভালবাসা খাঁটি হয়!ভালবাসাতেই তো কেবল হারানোর ভয় থাকে।আর ও তো হারিয়েই অভ্যস্ত।এই দুশ্চিন্তা,অপেক্ষা এসবই তো ভালবাসারই লক্ষণ।ফোনের নোটপ্যাড খুলে বহ্নি লিখতে থাকে-

''ভালবাসারা হারিয়ে যাওয়ার জন্যই জন্মায়।ঠিক আকাশের তারার মতো।অপলক চোখে অগুনতি তারাদের মাঝে একটা তারার ঝিকমিকে আলো দেখতে-দেখতে একটু আনমনা হতেই বিস্তীর্ণ আকাশের বুকে কোথায় যে সেই তারাটা লুকিয়ে পড়ে আর খোঁজ পাই না।

প্রতিদিন সন্ধ্যা নামতেই আমার উন্মুখ চোখের তারা দুটো, ঐ হারিয়ে যাওয়া তারাটাকে খুঁজতে-খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।গভীর রাত বাড়তে থাকে।অখন্ড রাত।একসময় বেদনার ইথারে অসাড় হয়ে যায় মনটা।চোখের জল যায় শুকিয়ে।গভীর রাতে এলোমেলো স্বপ্ন নেমে আসে চোখে।সেই হারিয়ে যাওয়া ঝিকমিকে তারাটা তখন অন্য তারার সাথে আকাশের গায়ে চাঁদের আলোয় খেলায় মত্ত।

এমনি করেই সময় বয়ে যায়।জীবন থেমে থাকে না।শুধু অবাধ্য মনে কাজল কালো মেঘের মতো জমানো বেদনা ঘনিয়ে আসে।খোলা জানলা দিয়ে হু হু হাওয়া বয়।সেই ঠান্ডা হাওয়ায় কেবল চোখ দুটো অকারণে জ্বালা করে!!''

''কি হবে পুরোনো চিঠি ছেঁড়া খাম?
আতর মাখানো কিছু বদনাম!
প্রলাপের মতো কিছু প্রেমালাপ,
অবুঝ মনের কিছু সংলাপ!

মিথ্যেই মুঠো ভরা অভিমান,
বাঁশী? সুর?প্রেমে প্রাণ আনচান?
সব প্রেমই যন্ত্রণা, দহনে!
তিলে- তিলে মন মরে, গহনে।''

বৃষ্টির জলে চোখের জল মিশে যায় বহ্নির।কালো মেঘের আড়ালে তারারা হারিয়ে যায়।প্রদীপের শিখা কাঁপতে-কাঁপতে নিভে যায়।অন্ধকারে একরাশ ভয় এসে ঘিরে ধরে।ভোররাতে কাঁদতে-কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে ও।কি জানি অন্য স্বপ্নগুলোর মতো এই স্বপ্নটাও হারিয়ে যাবে না তো?অজানা আশঙ্কায় স্বপ্নের ভেতরই কেঁপে ওঠে বহ্নি।একটু বেলায় ঘুম ভাঙ্গে ওর। হতাশ হয়ে ফোনটা খোলে।দেখে শোভন মেসেজ করেছে।

''এখানে পাহাড়ে ধ্বস নেমেছে।রাস্তাঘাট বন্ধ।ফোনে কোনো কানেকশান ছিলনা।আজ সাতদিন বাদে একবারের জন্য টাওয়ার পেয়েছি।ফোন যাচ্ছে না।আমি ভাল আছি চিন্তা কোরোনা।তোমরা সাবধানে থেকো।''

বহ্নির বুক থেকে একটা পাথর নেমে যায়।জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখে ঝোড়ো প্রকৃতি সূর্যের আলোয় সবে একটু ম্লান হাসি হাসছে।

পরিচিতি:

বর্তমানে ইতিমধ্যে ফেসবুকের পাঠকমহলে ড. দেবানী লাহা মল্লিক তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। শুধু ফেসবুক নয়, অল্পবয়স থেকেই বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা, স্মারকগ্রন্থে অজস্র সাহিত্যরচনা করেছেন। জন্ম কলকাতায়, পেশায় ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড. মল্লিক অজস্র সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছেন। মানবমন ও তাঁর বিহেভিয়ারিজম নিয়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান, তাই তিনি ছোট- ছোট চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো সুন্দর করে উপস্থাপন করে পাঠকমনের সঙ্গে চরিত্রের মনন কে একাত্ম করে দেন। একজন প্রকৃত কথাসাহিত্যিকের কাজই হলো বাক্যকে মনের সঙ্গে, মন কে বাক্যের সঙ্গে পাঠকের সামনে তুলে ধরা 'নিতান্তই সহজ সরল ' ভাবে৷ তাই তার গল্পে বনেদী বাড়ির অন্দরমহল, শিশুমন, সমাজ, অবচেতন, ভালোবাসার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ পাঠকমন কে ভরিয়ে দেয়। সম্প্রতি প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প বইটিতে ড. মল্লিকের ত্রিশটি শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প সংকলিত হয়েছে।
শেয়ার করুনঃ