Note: Now you can download articles as PDF format
  • Short Story

অভিমান

  • ড.দেবানী লাহা(মল্লিক)
  • June 26, 2020
  • 64 বার পড়া হয়েছে
Download PDF

মেঘলা দুপুরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি আসতেই নদীর চোখ বেয়ে নোনতা জল গড়িয়ে পড়ল।দুপুরে মেঘ করলেই একলা ঘরে বসে নদীর বড় মন খারাপ হয়!কি একটা বিষাদের সুর বাজতে থাকে কানের কাছে।যেন কত-কালের জমানো অভিমান মোমের মত গলে পড়ে দুচোখ বেয়ে।কিসের এত অভিমান কে জানে!সেই ছোট্টবেলায় বাবা একবার বলেছিল-

''নদী তোকে একটা তানপুরা কিনে দেব।''

ভোরের আলো আঁধারী আলো এসে পড়বে জানলা দিয়ে নদী তানপুরায় গান ধরবে-

''জাগো মোহন প্যায়ারে।''

এই স্বপ্নটা দেখতে-দেখতে কতদিন নদীর ভোরে ঘুম ভেঙ্গেছে।কিন্তু তানপুরাতে গান আর তার গাওয়া হয়নি।বাবা তানপুরার কথা ভুলে গেছিল।খুব অভিমান হয়েছিল।আর কখনও নদী মনে করায়নি বাবাকে তানপুরার কথা!সেই অভিমানের ফোঁটা-ফোঁটা জল জমতে-জমতে কখন বৃষ্টি,কখন মেঘ,কখন ঠান্ডা তুষার হয়ে হিমঘরে জমে গেছে সেকথা নদীর মনে নেই।বাবা চলে গেছে কোন অজানা দেশে।শুধু বাবার বলা কথাটার সেই সুর আজও নদীর মনের ভেতর ঘুরে বেড়ায়।

মা একবার বলেছিল-

'' আমার ময়ূরকন্ঠী শাড়ীটা তুই একদিন পরিস নদী।''

ময়ূরকন্ঠী বড় পছন্দের রঙ নদীর।তারপর কতদিন কেটে গেছে সে শাড়ী ছিঁড়ে গেছে।নদীর আর সেই শাড়ীটা পরা হয়নি।মা সেকথা ভুলেও গেছে।তার বদলে অন্য রঙা কত শাড়ী মা দিয়েছে। তবু সেই ময়ূরকন্ঠী শাড়ী পরতে না পারার অভিমান নদীর পিছন ছাড়েনি।মেঘলা আঁধারে এইসব তুচ্ছ কথা কেন এমন মন ভার করে কে জানে!

যুবতী বেলার প্রথম ভালো লাগা সেই সদাচঞ্চল,চিরসবুজ,হাস্যময় উজানদা বলেছিল-

'' নদী তুই আমার প্রথম প্রেম,আমার ভালবাসার প্রথম নারী।তোর কাছেই প্রেম শিখেছি।বুঝেছি আদরের ভাষা।তোকে কখনও কষ্ট দেবোনা।চিরদিন আমার কাছে রাখব তোকে। ঝিনুকের ভেতর মুক্তোর মতো।''

তারপর কোন এক বর্ষাদিনে নদীতে যখন জোয়ার এলো,আকাশ জুড়ে মেঘ করল সেই মেঘের কাজল চোখে পরে নদী জানলা দিয়ে অনুরাগী দৃষ্টিতে তাকাল চিরসবুজ গাছগুলোর দিকে; ঠিক তখনই নদীর উজানদা কোন এক নীলকন্ঠী পাখির নীলিমায় মুগ্ধ হয়ে নীলাভ রঙ খুঁজতে-খুঁজতে চুপিসারে কোথায় যে হারিয়ে গেল!আর খুঁজে পেলনা কোনোদিন সে।নদীর বুকে ফেলে রেখে গেল একরাশ অভিমান।তারপর কত ফুল ফুটল,চাঁদ উঠল,জ্যোৎস্না ভাসাল পৃথিবী,ঢেউ উঠল সাগরে তবু সে কষ্ট মোছাতে নদীর উজানদা আর এলোনা।ঝিনুকের মুক্তো কোথায় ঝরে পড়ল কে জানে!এমনি কত অপেক্ষারা অভিমানী কাজল ধুয়ে-ধুয়ে নদীর বুকে মিশে যায়।কে তার খবর রাখে!

শুধু নদীর মনে জমা অভিমানী মেঘগুলো ভাসতে-ভাসতে জীবনের তীর ছুঁয়ে-ছুঁয়ে চলে আর চলে।অভিমানী মনের বিন্দু- বিন্দু বেদনাগুলি মিশে যায় চোখের জলে।কেউ দেখতে পায়না।চোখের জলের রঙ হয়না যে!

পরিচিতি:

বর্তমানে ইতিমধ্যে ফেসবুকের পাঠকমহলে ড. দেবানী লাহা মল্লিক তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন। শুধু ফেসবুক নয়, অল্পবয়স থেকেই বিভিন্ন ম্যাগাজিন, পত্রিকা, স্মারকগ্রন্থে অজস্র সাহিত্যরচনা করেছেন। জন্ম কলকাতায়, পেশায় ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড. মল্লিক অজস্র সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছেন। মানবমন ও তাঁর বিহেভিয়ারিজম নিয়ে তাঁর অগাধ জ্ঞান, তাই তিনি ছোট- ছোট চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলো সুন্দর করে উপস্থাপন করে পাঠকমনের সঙ্গে চরিত্রের মনন কে একাত্ম করে দেন। একজন প্রকৃত কথাসাহিত্যিকের কাজই হলো বাক্যকে মনের সঙ্গে, মন কে বাক্যের সঙ্গে পাঠকের সামনে তুলে ধরা 'নিতান্তই সহজ সরল ' ভাবে৷ তাই তার গল্পে বনেদী বাড়ির অন্দরমহল, শিশুমন, সমাজ, অবচেতন, ভালোবাসার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ পাঠকমন কে ভরিয়ে দেয়। সম্প্রতি প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প বইটিতে ড. মল্লিকের ত্রিশটি শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প সংকলিত হয়েছে।
শেয়ার করুনঃ