Note: Now you can download articles as PDF format
  • Small Novel

কর্কট কাল

  • সুদীপ ঘোষাল
  • May 29, 2020
  • 106 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


সিগারেট টেনে ধোঁয়া বের করে চলেছে চিন্তিত রামু।কি করে পরীক্ষা ভালো দেওয়া যায়।আজকে যা হলো তা হলো।কাল ফিজিক্স সেকেন্ড পেপার। লাভপুর কলেজের লাগোয়া হষ্টেলে রামু থাকে। পড়াশোনায় ভালো। কি করে আরও ভালো করা যায়। খুব চিন্তিত হয়ে সিগারেট টেনে চলেছে একের পর এক।
রামু খুব ভালো ছাত্র। প্রথমে সিগারেট খেতো না। বাবাকে ছোটো থেকে সিগারেট খেতে দেখেছে সে। তবু জানতো সিগারেট শরীরের পক্ষে ভালো নয়, মারাত্মক। কিন্তু লাভপুর কলেজ হষ্টেলে এসে বাবুরামের খপ্পরে পড়ে প্রথম তার সিগারেট ধরা। প্রথম প্রথম কাশির দমকে চোখে জল চলে আসতো। বাবুরাম বলতো,শালা মাগীর মত কাশছে দেখ। মেয়েরাও খায়। তবু তোর মত লেলা নয়। রামুর সম্মানে লাগতো। ভাবতো,দেখিয়ে ছাড়বো আমিও পারি। আমিও পুরুষ। আবার অসীম যখন বলতো,পুরুষত্ব দেখাবার আর জায়গা পাস না। সিগারেট খেলেই পুরুষ। বাবুরাম বলতো,সিগারেট খায় না পান করে। ধূমপান বলে কথাটা শুনেছিস তো?

অসীম প্রতিবাদ করেছিলো, সিগারেট খেতে হবে আর তা না হলে বুঝি কাপুরুষ। বাবুরাম কথাটা শুনে অসীমকে সেই রাতেই সিগারেট হাতে দিয়ে বলেছিলো, খা, তা না হলে আজ তোকে হষ্টেলের বাইরে রাত কাটাতে হবে। অসীম খুব রেগে গিয়েছিলো কিন্তু রামু বললো,ও ছেলে ভালো নয়। তোর বিছানায় জল ঢেলে দেবে। মুড়ির টিনে মুতে দেবে। অসীম স্যারের কাছে নালিশ জানাতে গেলো। দেখলো পথে দাঁড়িয়ে আছে বাবুরাম সদলবলে। বাবুরাম বললো,নালিশ জানালে তোর এখানে থাকা মুস্কিল হয়ে যাবে। জীবন নিয়ে টানাটানি হবে। রামু জোর করে অসীমকে নিয়ে গেলো নিজের ঘরে। বাবুরাম বললো,আগুনটা দে রে কালু। অসীম বাধ্য হলো সিগারেটে টান দিতে। পর পর তিনমাস নজরে ছিলো ওরা বাবুরামের।তারপর থেকে সিগারেটের নেশা হয়ে গেলো ওদের।

রামুর স্কুল লাইফে সুজয় নামে একটা বন্ধু ছিলো।অসীমকে বললো রামু শুনবি সুজয়ের কথা। অসীম বললো,বল,আজকে পড়ার অত চাপ নেই।তোর সুজয়ের কথা শুনি।

রামু বললো শুনে যা তবে,জীবনে একটু আনন্দের খোঁজে ঘুরে বেড়ায় সুজয়।কিন্তু সুখ তো সবার কপালে সয় না। আবার তার দেখাও পায় না সহজে। তবু সুজয় আশা ছাড়ে না। সে বিশ্বাস করে ঠিক একদিন তার যোগ্য সম্মান সে পাবেই।পৃথিবীর কোনো শক্তিই তার গতিরোধ করতে পারে না। সুজয় নিজের কাজ করে যায় আপনমনে। সে তার কাজকে ভালোবাসে। সঠিক ভাবে নিজের কাজ করতে পারলে সেই ব্যক্তি সাধক। এই মতবাদে বিশ্বাসী সুজয় জীবন রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে নিশিদিন। ছোটোবেলায় তার বাবার কাজ সে দেখেছে।কি নিষ্ঠা তার কাজের। মনে পরে সুজয়ের এক,একদিন বাবা কাজের চাপে বাড়ি আসতে পারতেন না।অফিসের কোয়ার্টারে রাতে থেকে যেতেন কাজের চাপে। সুজয় দেখেছে সংসারের কাজেও মায়ের সঙ্গে হাতে হাত লাগাতেন বাবা।মা অসীম ধৈর্যে সংসারের কাজকর্ম সারতেন নীরবে। এক সুন্দর সংসারের স্বপ্নে মশগুল থাকতো তার মন।

বেলুড় মঠ থেকে নৌকায় একবার দক্ষিণেশ্বর গেছিলো সুজয় মায়ের সঙ্গে।আর সঙ্গে ছিলো মেরী মাসি,লেখা মাসি,রণুদা আর সুজয়ের দুই ভাই। বিবেকানন্দ সেতুর নিচে প্রবল স্রোতে নৌকা টলমল করছিলো। তবু মা অসীম সাহসে আমাদের ধরে ছিলেন আর বলছিলেন, আমি আছি।
সুজয়ের মা খুব ভালো সাঁতার কাটতেন গঙ্গার জলে। গঙ্গা কাছে হওয়ায় প্রায় চলে আসতেন গঙ্গায়। তার আত্মবিশ্বাস ছিলো অপরিসীম। সুজয় মা, বাবা দুজনের কাছে পাকা করে নিয়েছিলো জীবন গড়ার ভিত।

তারপর সব উল্টেপাল্টে গেলো। পরিবর্তন হলো একমাত্র ধ্রুবক। সুজয়ের বাবা মারা গেলেন। কাকাবাবু মারা গেলেন। এখন মা, বড়দা সংসারের প্রধান। বড়দা আয় করেন। মা সেই টাকায় সংসার চালান। সুজয় ভাবে,কি করে তাড়াতাড়ি বড় হয়ে মা আর বড়দাকে সাহায্য করবে। কিন্তু ভাবলেই তো সবকিছু হয়ে যায় না। নিজেকে সময়ের বিচারে ছেড়ে দিতে হয়। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করার পরে সুজয় চলে এলো বড়দার কাছে। তারপর নরসিংহ দত্ত কলেজে ভর্তি হলো সুজয়। সুজয়ের বন্ধু হলো অনেক।গৌতম,অসীম,গোরা,বাবু, প্রবীর,হারু, মোহিনী,অশ্বিনী আরও কত বন্ধু।বেড়াতে গেলো পুরী,দার্জিলিং,মুকুটমণিপুর, পাটনা ও আরও অনেক জায়গা। বেশ ভালো চলছিলো।তারপর এলো বাস্তবের সঙ্গে মুখোমুখি হবার সময়। গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পরে অর্থের অনুসন্ধানে বাড়ি বাড়ি ছাত্রছাত্রী পড়াতে শুরু করলো সুজয়। মনে পড়ে সুজয়ের এক গুজরাটি বাড়িতে প্রিয়া পুরোহিত পড়তো তার কাছে। মেয়েটি ক্লাস টুয়েলভের ছাত্রী।সুজয়কে ভালোবেসে ফেললো প্রিয়া। একটা দোতলা বাড়ির নির্জন এক ঘরে দুজনে বসতো। প্রিয়ার বাড়ির অন্য লোকজন নিচের তলায় থাকতো। ফলে পড়াশোনার কোনো অসুবিধা হতো না। কিন্তু একদিন প্রিয়া সুজয়কে হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলো। চিঠিতে লেখা ছিলো,আই লাভ ইউ।

প্রিয়া পুরোহিত, ধনী লোকের একমাত্র মেয়ে। সে সময় কাটানোর উপায় হিসেবে ভালোবাসার অভিনয় করতো। তার কাছে ভালোবাসা, টাইম পাস ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু সুজয় তো মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। সে প্রিয়াকে ভালোবেসে ফেলেছিলো। কোনোদিন সুযোগ থাকা সত্বেও প্রিয়ার গায়ে হাত দেয় নি। প্রিয়া বলতো,আপ বাঙালি হ্যায় না,ইসি লিয়ে ইতনা সোচতে। আরে আইয়ে মোওজ কঁরে...

এই কথাগুলো বলে সুজয়ের কোলে শুয়ে পড়েছিলো প্রিয়া পুরোহিত। একে সুন্দরী,তারপর আবার নির্জন ঘর।সুজয় ভাবে, এই সুযোগ আর আসবে না। প্রিয়ার পরশে লোভের ফণা উত্থিত হয়েছিলো। ছোবল মারার আগে সুজয় প্রিয়াকে বললো,আমি আর তোমাকে পড়াতে আসবো না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। কিন্তু তোমার এই ব্যবহার আমার ভালো লাগে নি। তাই আমার এই সিদ্ধান্ত। তুমি ভালো থেকো। প্রিয়া সাহসি মেয়ে।সময়ে অসময়ে লুকিয়ে চুরিয়ে সিগারেট খেয়ে স্মার্ট হতে চাইতো। সুজয় নিষেধ করলেও শোনে নি।

তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। পার্কে একদিন সুজয় প্রিয়াকে দেখেছিলো অন্য আর একটা ছেলের সঙ্গে। সুজয় মুখ ফিরিয়ে চলে এসেছিলো। কিন্তু সে বন্ধু অমরকে বললো,আমার বুকটা ভারি হয়ে আছে বুঝলি। কেন এমন হলো বল তে?
অমর বলেছিলো,প্রথম প্রেম তো। ওরকম একটু আধটু হয়, বুঝলি।

তারপর সুজয় ডুব দিয়েছিলো আপন কাজে। নিজের সৃষ্টিতে মগ্ন হয়েছিলো সে। কিন্তু মদ আর সিগারেট হয়ে গেলো তার নিত্য সঙ্গি।

সুজয় ভাবে,মানুষ মন্দ কাজে মন দেবে না যদি একবার অরূপরতনের খোঁজ পায়। নিজের সৃষ্টিতে ডুব দিতে হবে। তা হলে আর কোনোদিন খারাপ কাজ করতে পারবে না।
সুজয় এখন সংগীতশিল্পী । বিভিন্ন স্থানে তাকে যেতে হয়। রাতের পর রাত জাগতে হয়। সে এখন কবিগানের দল করেছে। তার দলে দোহারি ও বাজিয়ে মিলিয়ে দশজন লোক আছে। অকৃতদার সুজয় আজীবন শহরে বাস করে গ্রামের মায়ার টানে চলে এসেছে গ্রামে। তার গান গাওয়ার ঢঙে মুগ্ধ হয়ে দলে যোগ দিয়েছে সবিতা। সবিতা খুব ভালো গান করেন। কবিয়াল সুজয়ের বিপক্ষ পাল্লাদার হিসাবে স্টেজে সে গান করে করে। দুজনেই উনিশ, বিশ। জমে যায় কবির আসর। আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে যায় ভক্তরা।

সবিতা ছোটো থেকেই গ্রামে মানুষ হয়েছে। কিন্তু সে গুরু হিসেবে পেয়ে গেছিলো মধু কবিয়ালকে।
রতনে রতন চেনে। মধু কবিয়াল বুঝতে পেরেছিলেন, সবিতা পারবে গান করতে। সনাতন কবিয়ালের বিশেষ স্নেহের পাত্রি ছিলেন সবিতা। তার গ্রামের স্কুলের মাষ্টারমশাই ছিলেন সনাতন কবিয়াল। দু দুজন কবিয়ালকে গুরু হিসাবে পেয়ে সবিতা শিখে নিয়েছিলো কবিগানের সমস্ত আদব কায়দা। ছোটোবেলা থেকে বড় অভাবে বড় হয়েছে সে। তাই তার গানে উঠে আসে প্রান্তিক মানুষের দুঃখ দুদর্শার কথা। এখন সবিতাদেবী ও সুজয়ের নাম শুনলেই ভিড় করে মানুষ শুনতে যায় তাদের গান। একশ,দুশো টাকার টিকিট কেটে কবিগান শোনার রেওয়াজ চালু করেছে মিতালি সংঘ। সত্যি যদি মানুষ কবিগানকে ভালোবাসে তাহলে কোনোদিন বন্ধ হবে না এই কবিগান। আজ মাইকে তারা এই কথাই ঘোষণা করছে। শয়ে শয়ে মানুষ টিকিট কাটছে।

তবে গ্রামের দিকে অনেক আগে থেকেই নবান্ন বা কোনো উৎসবে কবিগান হোতো। সাধারণত কোনো ক্লাব বা দল কবিগানের খরচ চালাতো চাঁদা তুলে। কিন্তু মিতালি সংঘ চাইছে, সব গানের মতোই টিকিট কেটে কবিগান শোনার পদ্ধতি চালু করতে। বিগত দশ বছরের প্রচেষ্টা তাদের। সফল হতে সময় লাগবে। তাদের সেক্রেটারী আদিত্য বলে।

জয়দেব ক্লাবের পক্ষ থেকে প্রচার চালায়। সে ভাবে, এখন ছেলেমেয়েরা কবিগান সহজে শুনতে পায় না। তারা যদি শোনে তাহলে নিশ্চয় তাদের ভালো লাগবে। তারাই তো এগিয়ে নিয়ে যাবে এই কবিগানের সুর।

জয়দেব সবুজের দলকে টাইগার হিল থেকে পদব্রজে আসতে দেখে পিছনের এক যুবকের গলায় মালা পরিয়ে দিলো। পিছনে পিছনে অনেকটা এগিয়ে গেলো। দেখলো,তারা গাছ রোপণ করছে।প্রায় দু মাস ধরে চলছে তাদের এই পদযাত্রা। সবুজের জয়গানে মুখরিত আকাশ বাতাস। ওরা চাঁদা তুলছে আরও গাছ কিনবে। তার খরচ আছে। অনেক লোক স্বেচ্ছায় চাঁদা দিচ্ছে। আবার একজন বললো,থাকলে নিজের খা, না থাকলে বকের পানে চা.. । সে বলছে,আমি চাঁদা দেবো না। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। জয়দেব ভাবে,এমন অনেক লোক আছে,যারয় সুবিধা ভোগ করবে কিন্তু কোনো দায়ীত্ব নেবে না। বিচিত্র জগত, বিচিত্র মানুষের মন। সব ঠিক আছে। এইভাবেই চলছে যুগ যুগ।

অসীম বললো,তারপর,সুজয়ের কি হলো বল।
রামু বললো,তার পরের ঘটনা মর্মান্তিক।সুজয় মারা গেলো গলার ক্যান্সারে।

তাহলে তুই বলছিস নেশা করলেই ক্যান্সারে মরবে।তুই তো গল্পের গরুকে গাছে উঠিয়ে ছাড়বি,অসীম হাসলো।
রামু বললো,গল্প নয়। জীবন থেকে নেওয়া সত্যি ঘটনা। তারপর রামু,অসীম ছিটকে গেলো জীবন সংগ্রামে।রামু তার সংসার আর চাকরী নিয়ে ব্যস্ত।ঘোরতর সংসারী।
রামু দুর্গাপুজোর সময় অজয়ের ধারে গিয়ে বসে থাকতো।সে বন্ধুকে বললো, শোন আমার এক অভিজ্ঞতার কথা তোকে বলি।

মহালয়ের সকালে আকাশের সাথে কাশফুলের রং ছড়ানো প্রতিযোগিতা চলছে ! এমন সময় শরতের মেঘ ঝরিয়ে দিলো রূপোলি বৃষ্টি। চারদিকে মহা সমারোহ প্রকৃতির বুকে। পুজো আসছে কিনা। তাই তাদের সময় নেই থমকে থাকার। পুজোর পাঁচটা দিন নদীর তীরে বসে থাকতে ভালোলাগে। কতকগুলো ঝুপড়ি বাসা জুড়ে অবহেলিত মানুষের বাস। পুজোর দিনে নগ্ন দেহমনে খিদের ছাপ। বসে আছি পুজোর প্রথম দিনে। আমার পরিধানে নতুন জামা দেখে আদুল গায়ের দুটি শিশু কাশফুল চিবোচ্ছে আর অবাক চোখে নতুনের গন্ধ খুঁজছে জামার ভাঁজে ভাঁজে। আমার বমি আসছে। চিকেন পকোরা পেটের মধ্যে বিরোধ শুরু করেছে। হাল্কা হয়ে শিশু দুটিকে বসিয়ে গল্প শুরু করলাম। দূর থেকে ঢাকের শব্দ ভেসে আসছে। শিশু দুটি মাথা দোলাচ্ছে। কাশ ফুলের গোড়া থেকে তখনও খাদ্যপ্রাণ শুষে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে দুজনেই। থাকতে না পেরে বললাম, তোদের বাড়ি কোনটা? চল আমাকে নিয়ে চল।

শিশু দুটির বাড়ি গিয়ে মাটির বারান্দায় বসলাম। তাদের মা বেরিয়ে এলো। গামছা জড়ানো গায়ে। কারণ শাড়িটি শতচ্ছিন্ন। আমি বললাম, ওদের বাবা কোথায়? মুখে কথা না বলে ঈশারায় দেখিয়ে দিলো। দেখলাম সকাল থেকে নেশা করে পরে থাকা মাতালের মতো ওর অবস্থা। একবার মুখ তুলে দেখার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে শুয়ে পরলো। চোখে ঘুম নিয়ে ওদের জন্ম। না দেখাই ভালো।ওরা চোখ চেয়ে থাকলে বিপ্লব ঘটে যাবে রাতারাতি। ঘুম ওদের ভুলিয়ে রাখুক খিদের জ্বালা।
তারপর পাঁচশো টাকা দিয়ে মাকে বললাম, মা তুমি চাল ডাল মাছ এনে রান্না করো। আমিও তোমাদের সাথে বসে খাবো।
আমার মা ডাকে গামছা দিয়ে চোখ মুছে সে দোকানের দিকে পা বাড়ালো।
পিছন থেকে আমি দেখলাম আমার দেশের মা তার শিশুদের আহারের ব্যবস্থা করার জন্য দৃপ্ত দুই পায়ে এগিয়ে চলেছে...

রামুর বাবা একটা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।কিন্তু নেশায় স্বভাব নষ্ট করে। সিগারট ধরাতেন ছেলের সামনে। রামুর মা বলতেন,সব ধোঁয়া আমার নাকে ঢুকছে। ছেলেরও ক্ষতি হবে।ভালো লাগে না। রামুকে পড়ানোর সময় সিগারেট টানতেন ফস ফস করে।রামুর বাবা বলতেন,অনেকেই তো বিড়ি,সিগারেট খায়।আমার বেলায় যত দোষ।রামুর মা আর কথা বাড়াতেন না।চুপ করে যেতেন।
একদিন রামুর মা অনেক আগেকার গল্প শোনালেন ছেলেকে, তিনি বললেন সব জা , একত্রে মিলিত হলাম ননদের বিয়েতে। একবার বিয়েতে পুণ্যলক্ষী দি ছেলে সেজেছিলো। প্যান্ট, জামা পরে চার্লি চ্যাপলিনের মতো একটা লাঠি নিয়ে অভিনয় করে চমকে দিয়েছিলে বিয়ে বাড়িতে। সব জা রা প্যান্ট পরা ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে যখন ভাশুরদের সামনে দাঁড়ালো,মাথা লজ্জায় নিচু করেছিলো পুরুষদল। তখনকার দিনে এটা একটা ভীষণ সাহসের ব্যাপার ছিলো। অভিনয়ের শেষে যখন জানতে পারলো প্রকৃত ঘটনা তখন সকলে হাসাহাসি আর চিৎকার শুরু করলো। নতুন বৌ বুঝতে পারতো একান্নবর্তী পরিবারের আনন্দ। বিয়ের শেষে যে যার চাকরীর জায়গায় চলে গেলে বাড়ি ফাঁকা লাগতো। নতুন বৌ এর ভালো লাগতো না। স্বামী চলে যেতো চাকরীর জায়গায়। বাড়িতে মা, বাবা আর বেকার দেওরের দল। তারপর জলের ধর্মে যে কোনো পাত্রের আকার ধারণ করতো নতুন বৌ। বাবা,মায়ের সেবা,দেওরের খাওয়া, রান্নাবান্না সব নজরে রাখতে হতো নতুন বৌকে। প্রাণমন ছটফট করতো বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য। শ্বশুর, শ্বাশুড়িকে রাজী করে শর্ত মেনে যেতে হতো বাবার বাড়ি। তখন পুরোনো মাটির গন্ধে নতুন বৌ ভুলে যেতো সব না পাওয়ার দুঃখ।

এদের দুই বোনের ক্ষেত্রে তাই হলো। মেয়ে দুটো চলে যাওয়ার দিনে অভয়, বৌকে বললো,খুব কান্না আসছে গো। ওদের ছেড়ে কি করে থাকবো। অভয়ের স্ত্রী বললো,এটাই তো নিয়ম গো। মেয়েরা পর হয়ে যায়। রামুর মা রামুকে নিজের জীবনের অনেক গল্প শুনিয়েছে।কাছে বসলেই রামু বলতো,তোমার ছোটোবেলার গল্প বলো না।রামুর মা ছেলেকে নিরাশ করতেন না।ছেলেকে পড়ানো হয়ে গেলে রামুর বাবা চলে যেতেন শোয়ার ঘরে।সামান্য আহার তার। দুটো রুটি,আলুভাজা।বিছানায় বসে খেতেন।

রাতে খাওয়া দাওয়ার পরে রামুর বাবা শিবুবাবু তার স্ত্রী পারুকে, আদর করে সিগারেটের ধোঁয়া মুখে ঢুকিয়ে দিতেন। তারপর একহাতে সিগারেট নিয়ে সঙ্গমে রত হতেন। পারু বলতো,তুমি না মাষ্টার। লজ্জা করে না।সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দাও প্লিজ।শিবুবাবু বলতেন,তাহলে তোমার সঙ্গে শোওয়া ছেড়ে দিতে হবে নাকি, মাষ্টার বলে।মাষ্টার বলে কি আমরা মানুষ নই। রক্তমাংসের মানুষ। আমাদেরও ইচ্ছে অনিচ্ছে বলে মতামত থাকতেই পারে।পারু কথা বাড়াতেন না। ডুবে যেতেন প্রবাহিত সুরে।

এখন রামু একটা সরকারী চাকরী করে।রামু ভাবে, বাবা রিটায়ার্ড পার্সন। মা গৃহবধু। ওনাদের ছুটি নেই। রিটায়ার্ডের বয়স নেই। মাইনে নেই। পেনশন নেই। তবুও মুখ বুজে শত লাঞ্ছনা সহ্য করে কাজ করে যান গৃহবধুরা।

তারপর শিবুবাবু সিগারেট হাতে একদিন ছেলেকে বললেন,চাকরী তো পেয়েছো। এবার বিয়ে করো। রামু বিয়েতে রাজী হলো। রামুর বিয়েতে ফুলশয্যার তত্ত্ব দেখে সবাই অবাক হলো। কাঁসার থালায় সাজানো ষোলোখানা ননদ পেটারী।রামুরা খুড়তুতো,জ্যাঠতুতো মিলে তিরিশ ভাই আর ষোলো বোন। বিশাল পরিবার। খুব আনন্দ করলো রামুর বন্ধুরা। এবার রামুর ফুলশয্যা। রামু উত্তেজনার বশে সিগারেট ধরিয়েছে। নতুন বৌ বললো,ঘরের মধ্যেই সিগারেটের ধোঁয়া, ভালো লাগে না। রামু বললো,বেশির ভাগ মেয়েরা ছেলেদের সিগারেট খাওয়া পছন্দ করে। আর তুমি করো না। রামুর বৌ কাজল বললো,আমি পছন্দ করি না। তুমি ঘরে সিগারেট ধরাবে না।

তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। কাজলের পুত্র সন্তান হয়েছে। সবাই খুব খুশি।
বেশ চলছিলো খুশির সংসার, পালতোলা নৌকার মত এগিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু একভাবে তো সব দিনগুলো চলে না। চক্রাকারে ঘুরপাক খায় সুখ দুঃখ। হঠাৎ রামুর মায়ের হাত থেকে একদিন খাবারের থালাটা পড়ে গেলো। আবার দুদিন পরে কাপ পরে গেলো। তার আরও পাঁচদিন পরে রগে দেখা গেলো টিউমার। রামু দেরী না করে মা কে নিয়ে কলকাতা রুবি নার্সিং হোমে নিয়ে গেলো। ডাক্তারবাবু দেখে বললেন,কপালে বা রগে এই ধরণের হঠাৎ ফুলে যাওয়া ফুসফুসের সংক্রমণ থেকে হয়। আরও পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রয়োজন।

তারপর দশদিন পর জানা গেলো রামুর মায়ের লাং ক্যানসার হয়েছে।
রামু বললো,ডাক্তারবাবু আমার মায়ের এই রোগ হলো। অথচ আমি,আমার বাবা স্মোকিং করি। আমাদের কিছু হলো না। বেশ আছি।
ডাক্তারবাবু বললেন,এই বেশ থাকাটা বেশিদিনের নয়। তাছাড়া আপনারা ধূমপান করলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা প্যাসিভ স্মোকার। তাদেরও এই রোগ হওয়ার প্রবণতা আশি শতাংশ বেড়ে যায়। আপনারও প্রস্তুত থাকুন।হলেও অবাক হবেন না।
রামুর চোখেমুখে অন্ধকার। কত বড় ভুল সে আর তার বাবা করে যাচ্ছে টের পেলো।সবার জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার তো তার নেই।

রামুর মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়েছে লাষ্ট ষ্টেজে।আর কয়েক মাস হয়তো বাঁচবেন। তিনি হাসপাতালে শুয়ে দেওয়ালে একটা ছবি দেখছেন।একটা গাছকে অর্ধেক কাটা হয়েছে। তবু তার ডালে ফুল ফুটে আছে। পাখিরা কলরব করছে। হাওয়ায় গাছের পাতাগুলো নড়ছে।রামু ভাবে, মা অই গাছের মত। স্নেহ,ভালোবাসা,মায়া,মমতা ঘিরে তার শাখাপ্রশাখা বিস্তৃত হয়ে আছে। ক্যান্সার কিন্তু এসব ছিনিয়ে নিতে পারে না।

ভালোবাসা জিইয়ে রাখে জীবন...

মায়ের ক্যান্সার হয়েছে শুনে রামুর পৃথিবীটা শূণ্য হয়ে গেলো জনব্যস্ত শহরের মাঝে। সে ভাবলো,এত সর্ষের ফুল কোথা থেকে এলো।সারা শহরে হলুদ সর্ষের ক্ষেত। মাথাটা ঝিম ঝিম করতে শুরু করলো। কি হবে আমার সংসারের।অসুস্থ বাবা,আমার চাকরী সব কিছুই রসাতলে যাবে। কি করবো আমি। হায় ভগবান। রামু মাথা চেপে ধরে ফুটপাতে বসে পরলো। শূণ্যের মধ্যেই যে মানুষ ভাসছে,এই সত্যটা বড্ড প্রকট হয়ে ধরা পরলো রামুর ভাবনায়।

রামুর বাবা শিবুবাবু শুনেছেন তার স্ত্রীর ক্যান্সার হয়েছে। তারপর থেকে নিজেকে অপরাধী ভাবতে শুরু করেছেন। রামুকে তিনি বলছেন,জানিস,আমি সিগারেট খেতাম ঘরের মধ্যে। তোর মা বারণ করলেও শুনি নাই রে। তার জন্যই আজ তোর মাকে হারাতে বসেছি।রামু বলে,বাবা একা তুমি নও।অনেক লোক এখনও এই ভুল করছে। আমাদের সকলকে সচেতন হতে হবে। সাক্ষাৎ মৃত্যুর সঙ্গে কোনো রফা নয়। ধূমপান ছাড়তে হবে, ছাড়াতে হবে। আজ থেকে আর নয় ভুল। এবার ভুলের মাশুল গোণার সময় এসেছে। ভুল সংশোধনের সময় এসেছে। কিন্তু ভুলের মাশুল বড্ড বেশি হয়ে গেলো, ঈশ্বর।

তবু রামুর মা, সাহস বাড়ানোর জন্য ছেলেকে,স্বামীকে বলছেন,আপনজনের শরীর অসুস্থ হলে মানুষ ঝাঁপিয়ে পরে তাকে সুস্থ করার আশায়। দিনরাত ছোটাছুটি করে সুস্থ করে তোলে রোগীকে। সুস্থ, তার জন্যই হলো ফলাও করে প্রচার করে অনভিজ্ঞ মানুষ। কিন্তু যে রোগী সুস্থ হয় না, চলে যায় অকালে সবাইকে ছেড়ে তার জন্য কেঁদে মরে সহজ মানুষ। কিন্তু অভিজ্ঞ মানুষ সুখে দুখে সমান থাকার ক্ষমতা অর্জন করে বাস্তব জগতে। কারণ সে জানে এক অদৃশ্য শক্তির নিয়ন্ত্রণে গোটা পৃথিবী চলছে। হেদিয়ে ম'রে, কোনো লাভ নেই। বিপদে,আপদে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নামই হচ্ছে প্রকৃত শিক্ষা। একমাত্র শিক্ষিত লোকেরাই এরকম স্বভাবের হন। পুঁথিগত শিক্ষা চরিত্র তৈরি করতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন আত্মিক শিক্ষা। সত্যিকারের চরিত্র গঠনের শিক্ষা। তোমরা উচ্চ শিক্ষিত। মৃত্যুকে সহজ করে মানতে শেখো।

শিবুবাবু অবাক হয়ে যান স্ত্রীর কথা শুনে।অন্তরে পাথর চেপে বসে আছে।তবু চোখের জল আড়াল করে তার অভয়দান রামুকেও বিস্মিত করে তুলেছে।একমাত্র মা পারেন সবকিছু সামাল দিতে। সেই মাকে আর কয়েক মাসের মধ্যে চলে যেতে হবে সব ছেড়ে। রামু ভাবে,মাকে ছাড়া সে থাকবে কি করে?রামু ঠিক করলো মাকে গ্রামের বাড়ি নিয়ে বেড়াতে যাবে। যে কটা দিন মা বাঁচবেন আনন্দ করে বাঁচবেন। গাজন দেখাতে নিয়ে গেলো গ্রামের বাড়ি পুরুলে।
রামুর গ্রামের নাম পুরুলিয়া। জেলার নামের সাথে মিলে যায় বলে সবাই পুরুলে বলে।রামুর মা বললেন,গাজনে গ্রামের বাড়ি এসে খুব ভালো লাগছে। রামু বললো,মা ছোটোবেলার মত তুমি গাজনের গল্প বলো। আমি শুনবো।

রামুর মা বললেন,তুই তো জানিস,এখানকার গাজন বিখ্যাত। প্রথমে শিবলিঙ্গ জল থেকে তুলে আনা হয়। তারপর মন্ডপ তলায় পরের দিন ভক্ত পরে।বলো শিবো মহাদেব, বলে বাবা শিবের ভক্তরা গড়াগড়ি দেয়। বিভিন্ন নাচের তালে তালে ভক্তরা প্রথম দিন মুখুজ্জে পুকুরে বাণেশ্বর নিয়ে ডুব দেয়।তারপর সবাই মন্ডপ্তলায় হাজির হয়।পরের দিন কালিতলায় ভক্তরা নাচ করে।গড়াগড়ি দেয়।বলো শিবো মহাদেব ধ্বনিতে, আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। গাজনের কয়েকদিন আগে থেকেই মরার মাথা জোগাড়ের কাজ শুরু হয়।বাবা শিবের পুজোয়, পুরুলের গাজনে মরার মাথা অপরিহার্য।
তারপরের দিন খেজুরভাঙ্গা অনুষ্ঠান।ঢাকের বাজনার তালে তালে ভক্ত বা সন্ন্যাসীরা খেজুর গাছ থেকে খেজুর পেড়ে বাবা মহাদেবের চরণে দেন। প্রথমে কাঁচা আম বাবার চরণে উৎসর্গ করার রেওয়াজ জনপ্রিয়।ভক্তদের হাতে বেতের লাঠি থাকে।সন্ন্যাসীদের মত কঠোর সংযমের মধ্যে এই কয়েকদিন কেটে যায়,বাবার ভক্তদের।খেজুর হাতে ভক্তরা গান করে।" ও সাজলে,খেজুর ভাঙতে গেলাম রে ভাই,খেজুর নাইকো গাছে,কি বলে আজ দাড়াবো ভাই বুড়ো শিবের কাছে"। তারপর ভক্তরা গড়াগড়ি দেয় মাটিতে মন্দিরের সামনে।সারাদিন বাড়িতে বাড়িতে স্বজনের আগমণে মুখরিত হয়ে পাড়া।প্রত্যেক বাড়িতে শুরু হয় খাওয়া দাওয়ার তোড়জোর।নববস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গ্রামের লোকজন বাবা শিবের পুজো দেখে। সারারাত ধরে চলে, বোলানের গান।মেলায় কেনাকাটি চলে সারাদিন ধরে।দুপুরে বাবার নকল ভক্তরা মদ খেয়ে নাচতে নাচতে দোল নিয়ে চলে যায় উদ্ধারনপুরের গঙ্গায় আসল ভক্তদের সাথে।সন্ধাবেলায় ফেরে মন্দিরে।সারারাত ধরে চলে বোলান গান।আশেপাশের সমস্ত গ্রামের লোকেরা বোলান গান শুনতে আসে।"আম খেলাম,জাম খেলাম পগাড়ে পেলাম আটি, সাত গাজন ঘুরে এসে ঢাকের পোঙায় কাঠি "। নানা হিন্দি গান আর বাংলা গানের সুরে গান করে বোলানের দল। টিকিতে পিয়াজ,লঙ্কা। মাথা নেড়া। এক অদ্ভুত সাজে ঘুরে বেড়ায় কিছু লোক।মনোরঞ্জনের নানা ফিকির।এক নিবিড় ভালোবাসার স্রোতে ভেসে যায় বোলানের রাত দিন।গ্রামের সকলের মুখে ফুটে ওঠে আনন্দের অনাবিল হাসি।যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই ধারা।তারপর শুরু হয় জলসন্নাস।এই দিনে আবার প্রান্তিক মানুষদের মদের আসর জমে ওঠে।লাঠি,সড়কি,তরোয়াল নিয়ে শুরু হয় নন্দি নাচ। ঢাকের তালে তালে নেচে ওঠে আবালবৃদ্ধবণিতার হৃদয়। আবার শিবের দোল চলে যায় গঙ্গা স্নানে। তারপরের দিন হোম হয়।এই দিনে উপোষী ভক্তরা পেট ভরে খায়।কিছুদিন পরে চড়কতলায় শুরু হয় মেলা। আবার এই চড়কতলার মেলায় শেষ হয় গাজনের লীলা।

রামু বললো,তোমার মুখে গাজনের গল্প শুনে আমার বাল্যকালের স্মৃতি মনে ভেসে ওঠে।

যখন বারো তোরো বছর বয়স তখন লিলুয়া সিনেমা হলে, ছোটোদের রামায়ণ, ছবিটা দেখতে ইচ্ছে হলো। আমরা চার ভাই একত্রে মাকে বায়না করতে শুরু করলাম, মা আমরা সিনেমা দেখবো। তুমি ছাড়া আমাদের গতি নাই। মা বললেন,যা,রবি মামাকে ডেকে নিয়ে আয়। আমরা রায়দের পুকুরের পাড় দিয়ে চলে গেলাম মামাকে ডাকতে। মামা,মা একবার ডাকছে। মামা বললেন,বুঝেছি,কোনো মতলব আছে।আমরা বললাম, প্যান্ট,জামা পড়ে একেবারে রেডি হয়ে এসো তাড়াতাড়ি।মামা বললেন,তোরাও রেডি হয়ে নে।চ,দেখি দিদি কি বলেন।মামা আসার পরে মা বললেন,ওদেরকে রামায়ণ দেখিয়ে নিয়ে এসো। এই নাও তিরিশ টাকা। তখন তিরিশ টাকায় অনেককিছু হয়ে যেতো।সিনেমা হলের বাইরে কত মানুষ। সবাই রামায়ণ- সিনেমা দেখতে এসেছে। আমরা ভেতরে ঢুকলাম। অন্ধকারে হোঁচট খেলাম। একজন টর্চ হাতে আমাদের বসার জায়গা দেখিয়ে দিলেন।আমরা তিন ঘন্টা মন্ত্রমুগ্ধের মত রাম রাবণের যুদ্ধ দেখলাম। কিভাবে শত যন্ত্রণা সহ্য করে সীতা পাতাল প্রবেশ করলেন তাও দেখলাম। তারপর বাড়িতে এসে মাকে গল্প শোনানোর পালা। মা বললেন,তিন ঘন্টায় রামায়ণ সবটা বোঝা যায় না। বড় হয়ে পড়বে। তখন আরও বুঝতে পারবে ঘটনাগুলো।
তারপর অনেকদিন কেটে গেছে।মেরি মাসি একদিন বললেন মাকে,আমার বিয়ে হয়ে গেছে।আমি পোলাদের সিনেমা দেখাবো নিজের খরচে।মা বললেন,কি সিনেমা?
মেরি মাসি বললেন,বিদ্যাসাগর। খুব ভালো বই।ছোটোদের দেখার উপযুক্ত সিনেমা এসেছে শিয়ালদার প্রাচীতে। সেই প্রথম ট্রামে চাপা। এর আগে আমরা ট্রেন দেখেছি, কিন্তু ট্রাম দেখিনি।সেটা ১৯৭৫ সাল। বিদ্যাসাগর,সিনেমা দেখে আমরা পড়াশোনায় জোর লাগালাম।বিদ্যাসাগর মহাশয়ের টিকি বেঁধে রাত জেগে পড়াশোনা করাটা আমাদের মনে গভীর দাগ কেটেছিলো।আমার মনে হত,আমি কেন পারবো না? নিশ্চয় পারবো।পরে বুঝেছিলাম, মহাপুরুষরা যা পারেন,সবাই তা পারেন না। একটা পার্থক্যের প্রাচীর অইখানে আঁকা হয়ে যায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে।

আমার বড়দা আর রবিমামা কলকাতায় ঘুরতে ভালোবাসতেন খুব।তখন তো টি,ভি ছিলো না সহজলোভ্য।তাই ঘুরে ঘুরে চিড়িয়াখানা,সিনেমা দেখে বেড়াতো মানুষের দল।এখন টি,ভি র দৌলতে বাড়িতে বসে সবকিছু পাওয়া যায়।কিন্তু ঘোরার আনন্দ পাওয়া যায় কি?

আমার প্রিয় বন্ধুর নাম ছিলো বিশু।বিশু যখন গ্রামে কাকার কাছে থাকতো তখন বেলতলা,তালতলা ঘুরে ঘুরে বেড়াতো। সামনেই ছিলো একটা পুকুর।বর্ষার দিনে ভিজতে ভিজতে বিশু টেঁটা নিয়ে বেড়িয়ে পড়তো মাছ ধরতে এক হাতে টর্চ আর এক হাতে টেঁটা বা বর্শা। ঝমঝম সুর তুলে বৃষ্টি বিশুকে পরম আদরে মায়ার চাদর জড়িয়ে দিচ্ছে মায়ের স্নেহে।
টর্চ জ্বেলে রাতের অন্ধকারে বিশু দেখলো,ওটা মাছ নয়। বিশাল আকৃতির একটা শাঁখামুটি সাপ পাক দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে একটা মাগুর মাছ।তার পাশেই বিশাল আকৃতির একটা রাঘব বোয়াল।মনে হচ্ছে বিশুর সামনেই আছে।বিশু জানে এটা টর্চের আলোয় অসদবিম্ব গঠিত হয়েছে।রাঘব বোয়াল কিন্তু তার একটু পাশে।বিশুর টেঁটার অভ্যর্থ নিশানায় বিদ্ধ হলো প্রায় পাঁচ কেজি ওজনের বোয়াল মাছটা।দুহাতে জড়িয়ে ধরে নিয়ে এলো বাড়িতে। বগলে জ্বলে থাকা টর্চ।কাকাবাবু বললেন,ঠিক বুঝেছি,তুই পুকুরে গেছিস। সাপে খেয়ে মরবি যে। বিশু জানতো,আপনজনের সব সময় প্রিয় মানুষের জন্য মন্দ চিন্তাই হয়।

কাকাবাবু ও বিশু অই মাছ পাড়ার সবাইকে ভাগ করে দিয়েছিলেন।

রামুর চোখে জল।গল্প শোনাতে গিয়ে ডুবে গেছিলো হারানো সুরের জগতে। তখন ছিলো না কোনো ভয়। রামু ভাবে,এখন যদি বিশুকে এক বার দেখতে পেতাম তাহলে ও বোধহয় সব সমস্যার সমাধান করে দিত।কিন্তু মায়ের রোগটা তো দুরারোগ্য ক্যান্সার।নো আ্যনসার।চোখের জল গড়িয়ে পড়ে সিগারেটের আগুন নিভিয়ে দিলো।সে ভাবলো,না আর সিগারেট বা অন্য কোনো ধূমপান সে করবে না আর সমাজে ধূমপান বিরোধী প্রচার চালাবে। তাহলে হয়তো কিছুটা হলেও শান্তি পাওয়া যাবে।

অনেক কষ্টে রামু সিগারেট খাওয়া ছাড়লো। আশেপাশের তরুণ ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে ধূমপান বিরোধী প্রচার সমিতি গড়ে তুললো।বেশ সাড়া পেলো রামু। সে সকলের হাতে ধরে অনুরোধ করলো ধূমপান বন্ধ করার জন্য।অন্য তরুণরাও মাইকে প্রচার চালিয়ে গেলো। কেউ শুনলো, কেউবা থোরাই কেয়ার করে ধূমপান করলো তাদের সামনে।রামু বললো,হাল ছাড়লে হবে না। সে তার সঙ্গিদের গল্পের ছলে বললো,নতুন বছরে নতুন মন নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্পৃহা জেগে ওঠে মনে। তারপর এই ইচ্ছেটা ধরে রাখাই খুব কঠিন কাজ বলে মনে হয়। প্রথম প্রথম কবিতা লিখতে এসে পাতার পর পাতা ভরে যায়। কিন্তু যখন কোবিতা, কবিতা হয়ে ধরা দেয় ভাষা যায় ফুরিয়ে। ছমাসে,নমাসে হয়ত একটা কবিতা ধরা দেয়।
এখানেই মহাপুরুষের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য। তাঁরা হাল ছাড়েন না। লেগে থাকেন। আর লেগে থাকলেই হবে। যে কোনো কাজে সফল হওয়া যাবেই। প্রেমে লেগে থাকলেই হবে। পড়াশোনায় তাই। লেখা,জোখা সমস্ত কিছুতেই লেগে থাকলেই,চর্চা করলেই সফলতা পাওয়া যায়। তাই লেগে থাকতে হবে। বিফলতাগুলো সফলতার এক একটা স্তম্ভ।

ইতিমধ্যে রামুর মা মরে গেলেন অনেক কষ্ট পেয়ে।রামুর বাবা পাগলের মত হয়ে গেছেন।রামুর বয়সও বেড়েছে আর বেড়েছে কাশিটা। রামু আর রামুর বাবা চলেছে ডাক্তারের কাছে। বায়োপ্সি করাতে হবে ফ্যামিলি ডাক্তার বলেছেন।

রামুর হৃদয় সিগারেটের ছাইয়ের মত পুড়ে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে আসন্ন বিপদের আশঙ্কায়।

বিরাজুল মানুষ হয়েছে তার চেনা জগতে। ভোরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই আম্মির মুখ দেখে শুরু হতো তার দিন। সারাদিন স্কুলে কাটতো ছেলেবেলার জগত।

মনে পরে স্কুল থেকে এসেই ব্যাট হাতে বেরিয়ে পরতো ক্ষেত্রপালতলার মাঠে। জাহাঙ্গীর,মতিউল্লাহ,সিরাজ,ইজাজুর,সামিম, সুদীপ্ত,বাবু,ভম্বল,বিশ্বরূপ,মিলু,অধির সব বন্ধুরা জড়ো হতো ক্রিকেট খেলবে বলে। খেলার শেষে বসে গল্প করতো। প্যান্ট না পরে লুঙ্গি পরে মাঠে এলে তার মাথায় তুলে দিতো লুঙ্গি বন্ধুর দল। লুঙ্গি পরে খেলার অসুবিধা। বলতো,বিরাজুল। হোলে, বল লেগে একবার অজ্ঞান হয়ে গেছিলো এক বন্ধু। ধীরে ধীরে সকলের প্যান্ট পরে আসার অভ্যাস হয়ে গেলো। ম্যাচ খেলতে যেতাম অনেক জায়গায়। একবার বিল্বেশ্বর গ্রামের টিমকে হারিয়ে জিতেছিলাম এক হাঁড়ি রসগোল্লা। সুধীনবাবু ধরিয়ে দিলেন বিরাজুলের হাতে ক্যাপটেন হিসেবে। সবাই ভাগ করে খেলো। পুরস্কারের এই অভিনবত্বে অধুনা কানাডা বাসী মিলুদা খুব খুশি হয়েছিলেন।
বিরাজুল আজ রূপাকে বলছে তার ছাত্র জীবনের কথা,
তখন ১৯৮০সাল। আমরা দশজন বিল্বেশ্বর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম। একটা রেকর্ড রেজাল্টে সবাই খুশি হয়েছিলেন সেবার। তারপর জীবন যুদ্ধে সবাই আলাদা হয়ে গেলো। কে যে কোথায় পড়তে গেলো কোনো খবর পেলাম না। কিন্তু পুরোনো অনেক ক্লাসমেটের সঙ্গে যখন দেখা হয়, মনে পরে যায় পুরোনো দিনের কথাগুলো।
বিরাজুল ববলে চচলেছে,একবার স্কুল থেকে ছাত্রদের নিয়ে বেড়াতে গেছিলেন স্কুলের শিক্ষক মহিমবাবু। ঘুরে এসে অজয় নদীর ধারে যখন এলাম, তখন রাত্রি দশটা বেজে গেছে। নদীতে বর্ষার উদ্দাম গতি। কানায় কানায় ভর্তি জল। মহিমবাবু চিন্তায় পরে গেছেন, কি করে চল্লিশটা ছেলে নদী পার হবে। হঠাৎ আমরা অবাক হয়ে চেয়ে দেখলাম পাঁচজন সাহসী ছেলে হাফ প্যান্ট পরে খালি গায়ে লাফিয়ে পরলো জলে। আমরা সবাই হায় হায় করে উঠলাম ভয়ে। কিন্তু আমরা ভুলে গেছিলাম এই বাংলার দামাল ছেলেরা স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছিলো নিজের প্রাণের বিনিময়ে ওই লালমুখো বাঁদরদের কাছ থেকে। কিছেক্ষণের মধ্যেই দেখলাম, দুটো নৌকো নিয়ে তারা ছেলেদের নদী পার করছে। মহিমবাবু বললেন,মাঝিরা এলো না? শ্যাম বললো,স্যার চিন্তা করবেন না। ওদের ঘুমের ব্যাঘাত না করে আমরা নৌকো নিয়ে এসেছি। ওরাও জানে শ্যাম থাকলে কোনো ভয় নেই।
মহিমবাবুর চোখে জল এসে গিয়েছিলো। দুহাত তুলে আশীর্বাদ করেছিলেন দামাল পাঁচ ছাত্রকে।

আর ছোটোবেলা থেকে মুসলিম পাড়ার ছেলে মেয়ের সঙ্গে খেলতো রূপা। রূপে,গুণে অতুলনীয়া। সে বিরাজুলের সঙ্গে খেলতো বেশি। বিরাজুলকে না দেখলে ভালো লাগতো না রূপার। কেন ভালো লাগতো না, সেকথা বুঝেছিলো অনেক পরে। বালিকা বয়সের ভালোলাগা, ভালোবাসায় পরিণত হয়েছিলো।

ধীরে ধীরে স্বর্ণলতার মতো বেড়ে উঠলো শরীর ও মন। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কে কোথায় ছিটকে গেলো কে জানে? শুধু বিরাজুল,আর রূপা কাকতালীয় ভাবে একই কলেজে রয়ে গেলো। দুজনেই সুরেন্দ্রনাথ ল কলেজে পড়ে। সল্টলেকে একটা কোয়ার্টারে তারা ভাড়া থাকে। ল পাশ করে তারা দুজনেই যাবে বিলাত। হায়ার স্টাডির জন্য।
হিন্দুর মেয়ে মুসলিম ছেলের সঙ্গে থাকে,শোয়,খায় একথা প্রচার হতে বেশি সময় লাগলো না। রূপা বললো,জীবনটা আমাদের। কে কি বললো যায় আসে না। বিরাজুল ও রূপার রেজেষ্ট্রী ম্যারেজ হয়ে গেলো। দুজনে এখন শোয় একসাথে। কন্ডম ব্যবহার করে। ছেলেপুলে এখন নেবে না। বিরাজুল বলে,প্রথমে দুজনে ভালো আয় করবো। তারপর ছেলেপুলে নেবো।

গ্রামে একটা রসের আলোচনা এই দুজনকে নিয়ে। ওরা জাত দেখে, মানুষ দেখে না। ওরা পোশাক দেখে হৃদয় দেখে না, বলে বিরাজুল। বিরাজুলও আর বাড়ি যায় না। ওদের বাড়ির অ নেকেই এই বিয়ে মন থেকে মানতে পারে নি।

রূপাও বিরাজুল একদিন বিদেশে পাড়ি দিলো
কানাডার টরেন্টো শহরে বাসা নিলো। দুজনেই কাজ পেয়ে গেলো। মাইনে মোটামুটি। তার সঙ্গে পড়াশোনা। রূপা দেখেছে, শরীর বেশিদিন ভালো লাগে না। ও বিরাজুলের মন দেখেছে। একটা সুরের সাধককে দেখেছে ওর মধ্যে, যে সুরের সাধনা না করেও মানুষের মনসুরের সন্ধানে ব্যস্ত। ওদের দুজনেরই এখন দেশের কথা মনে পরে।

বিরাজুল ভাবে,আব্বা তাদের নবাবের মতো মানুষ করেছে। তাকে দেখেই শিখেছে, মানুষের হৃদয়ধন খোঁজা। আব্বা বলতেন,মন বড় রাকবি। মন বড়ো থাকলেই দেকবি মানুষের হৃদয়ে আল্লার অধিষ্ঠান। হৃদয় হলো মসজিদ আর মানুষ হলো আল্লার দূত। কোনো মানুষই ছোটো নয়। যদি একটা মানুষের মনে জায়গা করতে পারিস, তাহলেই তোর জীবন ধন্য হয়ে যাবে।
আম্মির আদরে বিরাজুল মানুষ হয়েছিলো। সেই আম্মিকে ছেড়ে তার মন খারাপ করে। কিন্তু জীবনে সাধনার জন্য অনেক কিছুই ত্যাগ করতে হয়। কুয়োর ব্যাঙ হয়ে থাকলে পৃথিবীটা অচেনা হয়ে যাবে।

রূপা বাবার খুব আদরের একমাত্র মেয়ে। মা,বাবাকে রাজী করিয়ে সে বিরাজুলের সঙ্গে ঘর ছেড়েছে। মা,বাবাকে সে বলেছে,চিন্তা কোরো না, আমি ওর সঙ্গে সুখে থাকবো। আর ওর সঙ্গেই আমার সাধনার সুতো জড়িয়ে আছে।

যে বিষয়ে রূপার অসুবিধা হতো পড়ার সময়, বিরাজুল সেই অসুবিধাগুলো সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলতো রূপাকে। ফলে রূপাকে পড়ার সময় ঝামেলায় পরতে হতো না। দুজনের সুন্দর এক বোঝাপড়া ছিলো।

রূপার মনে পরছে পিউ তার বান্ধবী,আর সে ন্যাশানাল পাড়ায় একটা বাড়িতে ভূত দেখেছিলো।

পিউ স্কুটি চালিয়ে বাজারে গেছিলো। বাবাকে বাজার করতে দেয় না। বাবা পুজো নিয়ে ব্যসত থাকেন। আজ পিউ এর পায়ে একটা পাথর লেগেছে। ব্যাথা হচ্ছে। রাস্তার ঢালাই এর পাথরগুলো রাক্ষসের মতো দাঁত বের করে আছে। নামেই ঢালাই। আর হবে না কেন। যারা চেয়ার দখল করে বসে আছে তারা ঘুষ খাবে। তবে অনুমোদন দেবে রাস্তা তৈরি করার। তারপর যে তৈরি করবে সে খাবে। তারপর তলানি। এতে আর কি হবে।

ভিতরে ঢুকতেই পিউ এর বাবা বললো,কি হলো পায়ে। পিউ বললো,ও কিছু না,একটু লেগেছে। মা বললো,যা করবি একটু দেখে শুনে করবি।
পিউ ব্যাগ রেখে তার প্রিয় বান্ধবী রূপাকে ফোন করলো। ছোটোবেলা থেকে ওর সঙ্গে অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। একবার ওরা ভূত দেখেছিলো।

একবার ন্যাশানাল পাড়ার একটা বাড়িতে ভূত দেখেছিলো দুজনে। একটি বাচ্চা মেয়ে সামনে এসে বললো,একবার এসো আমাদের বাড়ি। আমার মা ডাকছে। রীতা বললো,তোর মা কে তো চিনি না।
মেয়েটি বললো,একবার এসো না।
ওরা ভিতরে গিয়েছিলো। তারপর দেখলো মেয়েটা আর ওর মা হাত বাড়িয়ে নারকোল গাছ থেকে নারকোল পেরে আনলো। তারপর এক কিল মারলো। নারকোল ভেঙ্গে গেলো। তারপর রক্ত হাতে বললো,খা, খা।
ভয়ে ওরা ছুটে বাইরে এলো। রীতা ও পিউ মামুদপুরের মেশোকে বলেছিলো ঘটনাটা। তিনিও ভয়ে পালিয়েছিলেন। মেশো তার আত্মীয় অমলকে ঘটনাটা বলেছিলো। অমল বন্ধুদের বলেছিলো। পিউ এর মনেআছে অমল ও তার বন্ধুরা সবাই আড্ডা মারছে। এমন সময় অমল বলে উঠলো, জানিস ন্যাশানাল পাড়ার বনের ধারে যে তিনতলা লাল বাড়িটা আছে সেখানে নাকি ভূত দেখা গেছে।
মিহির বললো, তাহলে তোএকদিন সবাই মিলে গিয়ে দেখে আসতে হবে।
পিউ আর রূপা দোকান গেছিলো। সে বললো,টোটোনদা সত্যি আমরা দেখেছি ভূত নিজের চোখে। যা করবে সাবধানে কোরো আর পারলে ঘনাদাকে সঙ্গে নিও। ওর সাহস আছে।
টোটোন বলে উঠলো, তোরা খুব আজগুবি কথা বলিস। আরে টোটোন থাকতে ভূতের বাপও বাড়ি ছেড়ে পালাবে। চল তাহলে একদিন দেখাই যাক। আমরা সামনের অমাবস্যায় ওই বাড়িতে যাবো। ফিষ্ট করবো। মাংস আর লাল জল। বুঝলি কিনা। জমবে ভালো।

অমল বললো, শোন আসল কথাটা বলি। আমার মামুদপুরের মেশো একদিন আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলো। বিকালে ওই বাড়ির দিকে বেড়াতে গেছিলো। একট বাচ্চা ছেলে কাঁদতে কাঁদতে মেশোকে বললো, আমার খিদে পেয়েছে। মামা জিলাপি কিনে ছেলেটাকে বললো, যাও খেয়ে নাও।

ছেলেটি নাছোড়বান্দা। বললো, আমার বাবাকে দেখবে এসো। কতদিন খেতে পায়নি। এসো দেখে যাও।
মেশো সরল লোক। মায়া হলো। ভিতরে গিয়ে দেখলো বাবা নয়। এক ভয়ংকর স্কন্ধকাটা ভূত। বললো, আমার গলা কেটে সবাইকে মেরে আমার সংসার শেষ করেছে তোর মতো একটা পাষন্ড। আমি কাউকে ছড়বো না। কাটা মুন্ডুটা হাতে। সেই মুন্ডুই কথা বলছে।
মেশো ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে। এবার ভবলীলা সাঙ্গ ভাবছে মেশো। এমন সময় ছেলে্টি সামনে এসে বললো, বাবা এই লোকটি ভালো। জিলাপি কিনে দিয়েছে। এই বলে ছেলেটি উড়তে উড়তে জিলাপি খেতে লাগলো। উড়ন্ত অবস্থায় ছেলেটির মা বললো, এঁকে ছেঁড়ে দাঁও। যাঁও যাঁও। জিঁলাপি খাঁও।
তখন সুযোগ বুঝে মেশো পালিয়ে এসে বাঁচে।

টোটোন ভয় লুকিয়ে বাতেলা দিলো অনেক। বললো, ঠিক আছে আমরা কুড়িজন একসাথে যাবো ওই বাড়িতে। দেখা যাবে। কত ধানে কত চাল। তবে ঘনাকে সঙ্গে নিস বাবা।
চালাক টোটোন। তাই দল বাড়াচ্ছে। ঠিক হলো কুড়িজন বন্ধু একসাথে যাবে। অনেক ছেলের মাঝে নিশ্চয় ভূত আসবে না।

মাঝের কয়েকদিন যে যার কাজ নিয়ে থাকলো। তারপর এসে গেলো সেই অপেক্ষার অমাবস্যা। দিনের বেলায় সবকিছু কেনাকাটা সেরে সবাই দুরু দুরু বুকে রাতের প্রতিক্ষায়। কিন্তু কেউ ভয় প্রকাশ করছে না। বাড়িতে কেউ বলে নি। সবাই বলেছে, আজ একজন বন্ধুর জন্মদিন। রাতে বাড়ি আসবো না। ওখানেই সব ব্যবস্থা।

রাতের বেলা ন্যাশানাল সিনেমা হলের কাছে সবাই একত্র হলো। সবাই চললো এবার সেই অভিশপ্ত বাড়িতে। টোটন চুপ। কোনো কথা নেই। অমল বললো, কি রে টোটোন, চুপ মেরে গেলি কেন? কথা বল।

টোটোন বললো, এই দেখ আমার অস্ত্র। একটা মস্ত নেপালা বের করে দেখালো। তারপর বললো, ভূতের দফা রফা করবো আজই।

কথায় কথায় বাড়িটা চলে এসেছে কাছে। অমল বললো, চল ভিতরে ঢুকি। ঘনা বললো, তোরা যা, আমার কাজ আছে। তবে অই বাড়িতে ভূত আছে। পিউ আর রীতা আমাকে বলেছে। যাস না বাড়ি যা। ঘনাকে কেউ রাজী করাতে পারলো না। ঘনাকে পিউ আড়চোখে দেখলো। মনে মনে ভাবলো, কি সুন্দর চেহারা ছেলেটার।
দুজন লোক পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো। বললো, মরতে যেচো কেনে ওই বাড়িতে? খবরদার ওই দিকে মাড়িয়ো না। গেলেই মজা টের পাবে।
এখন আর ফেরার কোনো ব্যাপার নেই। হুড়মুড় করে সবাই ঢুকে পড়লো বাড়ির ভিতরে। তারপর মাকড়সার জাল, ধুলো পরিষ্কার করে রান্না শুরু করলো। এখনও অবধি কোনো ভৌতিক কান্ড ঘটে নি। ভয়টা সকলের কমে গেছে।
টেটোন বললো, অমল তোর মেশোর গাঁজার অভ্যাস আছে নাকি?
সকলের সামনে অমল একটু লজ্জা পেলো। তারপর ভাবলো, বন্ধুরা একটু ইয়ারকি মারে। ওতে ইজ্জত যায় না।
টোটোন এক পিস কষা মাংস নিয়ে লাল জলে মন দিয়েছে। সে এই দলের নেতা। সবাই অলিখিত ভাবে তাকে মেনে নিয়েছে নেতা হিসাবে। নেতা কষা মাংসতে কামড় মারার সঙ্গে সঙ্গে কষ বেয়ে লাল রক্ত। বোতলে রক্ত ভরতি। সবাই দেখতে পাচ্ছে কিন্তু নেতা দেখতে পাচ্ছে না। নেতাকে রক্ত মাংস খাওয়া ভূতের মতো লাগছে।
অমল কায়দা করে তাকে আয়নার সামনে নিয়ে দাঁড় করালো। নেতা নিজের রূপ দেখে ভয়ে বু বু করতে লাগলো। সবার প্রশ্ন এত রক্ত কোথা থেকে এলো?নেতা অজ্ঞান হয়ে গেলো।

তাকে জল দিয়ে জোরে হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করতে লাগলো বন্ধুরা। তারপর জ্ঞান ফেরার পরে আবার ভয়ের পালা। রাত তখন দশটা। দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেলো। আর চার দেওয়ালের গা বেয়ে নেমে আসছে রক্তের ধারা। এত রক্ত যে মেঝে দিয়ে গড়িয়ে সকলের পা ভিজে যাচ্ছে। নেতা এবার জোড় হাত করে বলছে, আমাদের ছেড়ে দাও, এই কান মুলছি, নাক মুলছি আর কোনোদিন এই বাড়িতে ঢুকবো না। দয়া করো আমাদের দয়া করো।

তখন আড়াল থেকে কথা শোনা গেলো, তুই তো নেপালা এনেছিস। সবাই দেখলো নেপালা নিজে থেকেই শূণ্যে ভাসছে। তারপর ভূত হাজির। নেপালা একবার ভূতের মাথা কাটছে আর জোড়া লেগে যাচ্ছে। বলছে, আমাকে কাটবি। মাথা কাটবি। তোর মাথা কাটি। নেতা ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে।

তখন অমল বললো, আমরা তোমার সাহায্য করবো। কে তোমাকে মেরেছে বলো। আমরা পুলিশকে জানাবো। সে শাস্তি পেলে নিশ্চয় তোমার আত্মার শান্তি পাবে। কথায় কাজ হলো সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে গেলো। রক্ত মুছে গেলো। আর একটা ছবি হাওয়ায় উড়ে এলো।

টোটোন ছবি দেখে বললো, একে আমি চিনি। নিশ্চয় একে পুলিশে দেবো। আমরা কুড়িজন সাক্ষী দেবো। তারপরে পুলিশ সব দায়িত্ব পালন করেছিলো। সেই বাড়ি এখন পুলিশ থানা। চাকরি পেয়েছে কুড়িজন সাহসী ছেলে। যাদের চেষ্টায় খুনী ধরা গেছে। আর অতৃপ্ত তিনটি আত্মা মুক্তি পেয়েছে।

ঘনা ভূতে বিশ্বাস করে। ও সহজ সরল ছেলে। ঝামেলার মধ্যে ও নেই। আর ওর বাড়ি অনেক দূরে। সেদিন ঢোল সারাতে এসে ওদের সঙ্গে দেখা।
ঘনার সাথে এই গ্রামের ছেলেমেয়েদের ছোটোবেলায় দু একবার কথা হয়েছে। কিন্তু খুব বেশি নয়। তারপর পরিচয় হওয়ার পর জানতে পেরেছে দুজনেই। প্রায় দশ বছর পরে ওদের দেখা। প্রথম দর্শনে কেউ বুঝতে পারে নি। পিউ হঠাৎ করে ঘনাকে ভালোবাসে নি। ভালোবাসার সুপ্ত বীজ পিউ এর অন্তরে গেঁথে গেছিলো ছোটোবেলা থেকেই। সে ঘনাকে চিনতে না পারার ভান করেছিলো।

ঘনা ভাবে চিনতে না পারাই ভালো। ওরা ধনী।তারপর আবার উঁচু জাত। ভালোবাসলে সমানে সমানেই ভালো। সমাজের নিয়ম আগে।

মাঝে মাঝে ঘনা জাল নিয়ে অজয় নদীতে মাছ ধরতে যায়।

আবার বিরাজুল ভাবে,দেশের বন্ধুদের কথা, তার আত্মীয় স্বজনের কথা।
এত কথা জেনেও কোনোদিন মুষড়ে পরেনি তার মন। ফুটবল খেলতে ভালোবাসতো সে। সারা বিকেল ছুটে ছুটে সে আনন্দ মাখতো সারা গায়ে। আলো নামের আলো মনের মেয়েটা জেনেশুনে তার সমস্তকিছু দিয়েছিলো দুদিনের আনন্দের দেবদূতকে।

তার সঙ্গে ঘুরতে গেছিলাম মুর্শিদাবাদের শালার। গঙ্গার ধারে গ্রামটি। ছোটো হলেও আমরা বন্ধুরা প্রত্যেকটি বাড়ি বাড়ি ঘুরেছি। কারো বাড়ি স্নান করা, কারও বাড়িতে খাওয়া দাওয়া।কারওবাড়িতে গান বাজনা করেই দিন চলে যেতো। সন্ধ্যা নেমে এলো জীবনে। রাত হওয়ার আগেই পাড়ি দিলো মন ভাবসাগরে।

কি করে একটা সাজানো বাগান তছনছ হয়ে যায় কালের প্রবাহে। বন্ধু অমিত বললো। তবু মানুষের এত অহংকার। তারা মনে করে মৃত্যু বোধহয় তাদের ভুলে গেছে। সে ভোলে না। হঠাৎ চলে আসে। সময় থাকতে অন্তত বাড়ির কাছের মানুষের সেবা করা ভালো।

অতনুর মনে পরে, বিরাজুল, রাজু আর তার দশজন বন্ধু পুজো বাড়ির শ্যাওলা পড়া দেয়াল ঘেঁষে বসতো। পুরোনো কারুকার্যের মুগ্ধতা ছাড়িয়ে ভালোবাসার গান বিরাট বাড়িতে প্রতিধ্বনি শোনাতো। বন্ধুদের মধ্যে চারজন মেয়ে ছিলো। দেবীকা বলতো, বন্ধু শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ করিস না। ভালো শোনায় না। কোনোদিন রাজু বা বিরাজুল তাদের মেয়ে মনে করেনি। বন্ধু তো বন্ধুই। তার আবার ছেলে আর মেয়ে কি?বলতো রাজু। একই কাপে তারা কফি খেতো পুজো বাড়ির পাশের কফি হাউসে । ভাগে কম হলে রূপসী বলে বন্ধুটা রাস্তায় লোকের মাঝে দীনেশকে ফেলে মারতো খুব।তাদের বন্ধুদল বিপদে,আপদে কাজ করতো গ্রামে। তাই তাদের অনেকেই সম্মান দিতো। আর আদরের এই মার খেতেই দুষ্টুমি করে তার ভাগেরটা কম রাখতো। অভিভাবকরা কোনোদিন ছেলে মেয়েদের মেলামেশায় বাধা দিতেন না।

দরজা ঘাটের বাঁধানো ঘাটে পানকৌড়ি আর মাছরাঙার কলা কৌশল দেখে পার হয়ে যেতো অবাধ্য সময়। অন্ধকারে ফুটে উঠতো কালীতলার সার দেওয়া প্রদীপ। ঘরে ঘরে বেজে উঠতো শঙ্খধ্বনি। হাতগুলো অজান্তে চলে যেতো কপালে। তারপর হাত পা ধুয়ে ভাইবোন একসাথে বসে সরব পাঠের প্রতিযোগীতা শুরু হয়ে যেতো। কে কত জোরে পড়তে পারে। একবার বুলু কাকা বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি শুনতে পেলেন অতনু পড়ছে, ন্যাটিওনাল মানে জাতীয়, ন্যাটিওনাল মানে জাতীয়। ঘরে ঢুকে কাকা বললেন,ন্যাটিওনাল নয় ওটা ন্যাশনাল। ঠিক করে পড়। অতনু জোরে পড়ছে বলে উচ্চারণটা ঠিক হলো। তারপর পড়া হয়ে গেলে একান্নবর্তী পরিবারের সবাই উঠোনে খেতে বসতো। আলাদা করে কোনো শিশুকে খাওয়া শিখতে হতো না,জোর করতে হতো না। সবার খাওয়া দেখে ধীরে শিখে যেতো নিজে খাওয়ার কায়দা।

শোওয়ার পালা আরও মজাদার। বড় লেপে তিন ভাইয়ের ঢাকা। কেউ একটু বেশি টানলেই খেলা শুরু হয়ে যেতো রাতে। কোনো কোনো দিন ভোরে। বড়দা আরও ভোরে উঠে নিয়ে রাখতেন জিরেন কাঠের খেজুর রস। সকালে উঠেই খেজুর রস। সেই দিনগুলো আর কি ফিরবে? বড় মন খারাপ হয় বড়ো হয়ে যাওয়া অতনুর।

তারা একসাথে ঘুরতো। খেলতো নানারকমের খেলা। চু কিত,কিত,কবাডি,সাতগুটি,ঘুরি ওড়ানো,ক্রিকেট,ব্যাডমিন্টন ও আরও কত কি। বন্ধুরা জড়ো হলে,এলাটিং,বেলাটিয়ং সই লো,যদু মাষ্টার কইলো..., তারপর আইশ,বাইশ কত কি। হাততালি দিয়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে খেলতাম,কাটুরিস,চায়না প্লিজ,মেম সাব, মেইন আপ... । তারপরের কথা, খেলা ডুব দিয়েছে কোন অতলে জানিনা, অতনু বলতো, সব কথা পুরো মনে পরে না। ছেঁড়া, ছেঁড়া স্মৃতিগুলো হৃদয়ের পদ্মপুকুরে ভেসে উঠেই ডুব দেয়, আর হারিয়ে যায় ব্যস্ত সময় সংসারে। সেখানে আবেগ মানে ছেলেখেলা পাগলামি। তবু তার মনে হয়, এরকম পাগলের সংখ্যা আরও বাড়ুক। বাড়লে পাওনাটা মন্দ হয় না।
রূপার মনে পরে কাকীমা, মা,জেঠিমার হারিয়ে যাওয়া দিনের কথা। তাদের বাড়িতে,সব জা , একত্রে মিলিত হতো ননদ বা দেওরের বিয়েতে। একবার বাসু দেওরের বিয়েতে পুণ্যলক্ষী বৌদি ছেলে সেজেছিলো। প্যান্ট, জামা পরে চার্লি চ্যাপলিনের মতো একটা লাঠি নিয়ে অভিনয় করে চমকে দিয়েছিলে বিয়ে বাড়িতে। সব জা রা প্যান্ট পরা ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে যখন ভাশুরদের সামনে দাঁড়ালো,মাথা লজ্জায় নিচু করেছিলো পুরুষদল। তখনকার দিনে এটা একটা ভীষণ সাহসের ব্যাপার ছিলো। অভিনয়ের শেষে যখন জানতে পারলো প্রকৃত ঘটনা তখন সকলে হাসাহাসি আর চিৎকার শুরু করলো। নতুন বৌ বুঝতে পারতো একান্নবর্তী পরিবারের আনন্দ। বিয়ের শেষে যে যার চাকরীর জায়গায় চলে গেলে বাড়ি ফাঁকা লাগতো। নতুন বৌ এর ভালো লাগতো না। স্বামী চলে যেতো চাকরীর জায়গায়। বাড়িতে মা, বাবা আর বেকার দেওরের দল। তারপর জলের ধর্মে যে কোনো পাত্রের আকার ধারণ করতো নতুন বৌ। বাবা,মায়ের সেবা,দেওরের খাওয়া, রান্নাবান্না সব নজরে রাখতে হতো নতুন বৌকে। প্রাণমন ছটফট করতো বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য। শ্বশুর, শ্বাশুড়িকে রাজী করে শর্ত মেনে যেতে হতো বাবার বাড়ি। তখন পুরোনো মাটির গন্ধে নতুন বৌ ভুলে যেতো সব না পাওয়ার দুঃখ।রূপার মনে পরে তার মায়ের কথা। কতবার বিরাজুলকে বলেছে,আমার মা সাধনায় ছিলেন রামপ্রসাদ। মা রক্ষাকালীর পুজো দিতে দিতে গেয়ে উঠতেন রামপ্রসাদি। নিরামিষ মা কালীর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ছেলেদের নিয়ে সংসার চালাতেন জীবনানন্দ ছন্দে। অভাব থাকলেও কোনোদিন তার ছাপ পরেনি মায়ের চোখেমুখে। আসল মূল্যবান রত্নের সন্ধান তিনি পেয়ে গেছিলেন পুজোর আসনে বসে। কোনোদিন তার কথায় প্রকাশ পেতো না সেসব কথা। তার চলনে, বলনে ফুটে উঠতো মাতৃরূপের জলছবি। মাকে দেখেই মাথা নত হয়ে যেতো সকলের। দাদু মাকে মা বলেই ডাকতেন। তিনি সময়ে অসময়ে মাকে রামপ্রসাদী শোনাতে বলতেন। মায়ের গান শুনতে শুনতে একদিন চলে গেলেন পরপারে তৃপ্ত মুখে। একবার বৈশাখি ঝড়ে আম গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়লো। মা বললেন,তোদের দাদুর আত্মা মুক্তি পেলো। অই ডালে বাঁধা ছিলো দাদুর মুক্ত হবার লাল চেলি। অবশ্য এটা ছিলো এক সাধুবাবার তুকতাক। বুড়ি ঠাকুমা সেদিন কেঁদে উঠেছিলো জোরে। ঠাকুমা বলে উঠলেন,চলে গেলো,ও চলে গেলো। কোনো কিছুই আমরা নিশ্চিতভাবে জানি না। তবু কিছু ঘটনা বার বার তার অস্ত্বিত্বের কথা স্বীকার করে নেয়। একটা দেশি কুকুর আমাদের বাড়িতে থাকতো ছোটে থেকে। তোমরা বিশ্বাস করবে কি না জানি না? সে অমাবস্যা,পূর্ণিমায় কিছু খেতো না। রক্ষাকালী পুজোয় উপবাস করতো। তার সামনে খাবার দিয়ে দেখা গেছে সে খাবারের ধারের কাছে যেতো না। শুধু কথা বলতে পারতো না। কিন্তু ভাবে, ভঙ্গিমায় সব বেঝাতে পারতো মানুষের মতো। মা বলতেন,পূর্বজন্মে তোর সঙ্গে কোনো আত্মীয়তা নিশ্চয় ছিলো। তাই তোর আমাদের বাড়িতে আগমণ। যেদিন জিম দেহ রেখেছিলো সেদিন ওকে মাটি চাপা দিয়ে ধূপ আর ফুলে শেষ বিদায় জানিয়েছিলো সারা পাড়ার বাসীন্দা। তাহলে কি বলবে তুমি এই ঘটনাকে। কোন যুক্তিতে অস্বীকার করবে তার সারা জীবন ধরে পালন করা ব্রত,উপবাস। বলবে,কাকতালীয়। সেসব তো এক আধবার হয়। সারাজীবন ধরে নিয়মিত হয় না।

বিজয়ার সময় আমার মা জিমকে প্রথম মিষ্টিমুখ করাতেন। ধান রাখার গোলার তলায় একবার গোখরো সাপ দেখে, ঘেউ ঘেউ শব্দ করে আমাদের দেখিয়ে দিয়েছিলো সাপটা। তারপর সাপুড়ে ডেকে সাপটি বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। বড়দার বিছানার মাথার কাছে সে শুয়ে থাকতো। কোনো বিপদ বুঝলে ঝাঁপিয়ে পরতো নিঃস্বার্থ ভাবে। প্রত্যেক প্রাণীর কাছে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু।

বিদেশে থেকেও তাদের দুজনেরই দেশের কথা,বাড়ির কথা মনে পরে। বিদেশে সব যান্ত্রিক। আবেগ তাদের কাছে ছেলেখেলা। শরীর সর্বস্য ভাবনা তাদের। ভালো গুণ অবশ্য অনেক আছে। রূপা ভাবে, এরা পরিশ্রমী। কাজ যখন করে তখন তার মধ্যেই ডুব দেয়। নিজের কাজ নিজে করতে ভালোবাসে। কুড়ি কিলো ওজনের ব্যাগ বিদেশের মেয়েরা সহজেই পিঠে নিয়ে বহন করে। তবু তাদের নগ্ন সভ্যতার রূপের মাঝে,
তারা দুজনে বেশ মানাতে পারলো না। বিদেশের অনেক নিয়মনীতি তাদের ভালো লাগলো না। তাই তারা হঠাৎ করেই কলকাতা চলে এলো। তারপর সেখান থেকে গ্রামের বাড়ি। মাটিতে পা দিয়ে তাদের উল্লাস বেড়ে গেলো। মুঠো মুঠো মাটি তারা গায়ে, মাথায় মেখে তার ঘ্রাণে শুয়ে গড়াগড়ি খেতে শুরু করলো বনে। তারপর তেঁতুল তলার বন, ওদের পছন্দ হলো। টাকা পয়সার কোনো অভাব নেই। গ্রাম ছাড়িয়ে তেঁতুল তলার বনে ওরা গড়ে তুললো এন,জি,ও।ওরা শুরু করলো সেবাকেন্দ্র।

বিরাজুল ও রূপা মানুষের সেবায় নেমে পরলো। তারা গড়ে তুললো হাসপাতাল,নর সেবা কেন্দ্র প্রভৃতি। গরীব মানুষেরা এখানে এলেই বিনা পয়সায় খাবার পায়,স্বাস্থ্য পরিষেবা পায়। এই হলো তাদের সংসার,আনন্দের জায়গা।

আশেপাশের গ্রামের মানুষরা হলো তাদের মন-মসজিদ আর মন্দিরের দেবতা...

একবার বন্যায় স্টেশনে নেমে সমর দেখলো শুধু জল আর জল।যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু জলের ঢেউ।ভেসে যাচ্ছে খড়ের চাল,বাসনপত্র,গোরু,মোষ,ছাগলের দল।আর একটু পরেই স্টেশনে জল উঠে পড়বে।আশ্বিন মাসে প্রতিবার সমর পুজোর কেনাকাটি করে গ্রামে আসে।জল প্রায় প্ল্যাটফরম ছুঁই ছুঁই।সমর সতর্ক হলো।একটা গ্রামের ছেলে এসে বললো,সমরদা বাড়ি এলে।কিন্তু যাবে কি করে? সমর বললো,তোর মালপত্র কিছু আছে নাকি?গ্রামের ছেলেটির নাম রঘু। সে বললো,আমি বন্যার জল দেখতে এসেছি। সমর বললো,আমার এই ব্যাগ দুটো নিয়ে যেতে পারবি। তোকে পাঁচশো টাকা বখশিস দেবো।রঘু রাজি হলো। বললো,তোমার যতগুলো ব্যাগ আছে আমাকে দাও। সমর বললো,তার প্রয়োজন নেই। তুই দুটো নিবি। আমি দুটো নেবো। কাঁধে ঝুলিয়ে নে। তারপর ওরা গাছ থেকে দুটো শক্ত ডাল ভেঙ্গে নিলো।কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, হাতে লাঠি নিয়ে ওরা নেমে পরলো বন্যার জলে। কোমর অবধি জল। রঘু আগে আগে চললো।সমর বললো,তোর ভয় নেই। স্রোত বেশি হলে আমি তোকে ধরবো।হঠাৎ একটা সাপ ওদের কাছে ভেসে চলে এলো। বেশ বড় শাঁখামুটি সাপ।রঘু বলে উঠলো,বাবা গো। সমর লাঠি দিয়ে সাপটাকে একপাশে স্রোতের মুখে ঠেলে দিলো। সাপটা ভাসতে ভাসতে চলে গেলো দূরে।

প্রায় দুঘন্টা পরে ওরা গ্রামে এলো।গ্রাম চেনা যাচ্ছে না। সমর দেখলো,মাটির বাড়ি সব ভেঙ্গে গেছে। গ্রামটা কেমন ফাঁকা লাগছে। সমরদের একতলা পাকা বাড়ি। কিন্তু ঘরে জল ঢুকেছে। তাই ছাদে ত্রিপল টাঙিয়ে বাড়ির আত্মীয়স্বজন সব আছে। সমর রঘুকে টাকাটা দিয়ে ব্যাগগুলো ভাইয়ের হাতে দিলো।তারপর ছাদে উঠে গেলো।বৃষ্টি শুরু হলো আবার। রেডিও খবরে শুনলো সমর,বৃষ্টি আরও তিনদিন হবে।এক লাখ কিউসেক জল ছেড়েছে। বন্যার জল আরও বাড়তে পারে। হেলিকপ্টার থেকে চিড়ে,গুড় ফেলা হচ্ছে বন্যার্তদের জন্য।সতর্ক বার্তা জারি হয়েছে রাজ্যবাসীর জন্য। সমর রেডিও বন্ধ করে ভিজে জামা কাপড় ছেড়ে চা খেলো।বাড়ির সকলের সমরকে দেখে খুব আনন্দ।কিন্তু দুর্গাপুজোর আগে বন্যার জন্য সব আনন্দ জলে গেলো। সমরের ভাই অমর বললো

,পুজো বাড়ির ঠাকুর জলে ভিজে গেছে। অসুরের রঙ উঠে গেছে। আবার রঙ দিতে হবে নতুন করে। সমরের বাবা ব্যাগ খুলে দেখছেন,ছেলে কি বাজার করেছে।জামা,প্যান্ট, কাপড়,ধূতিসব সুন্দর হয়েছে।সমরের বাবা খুব খুশি।তিনি বললেন,কাজের মেয়ে রাণী আর মুড়ি ভাজুনির জন্য কাপড় এনেছিস তো?সমর বললো,হ্যাঁ,দেখো অন্য ব্যাগে আছে।

বাবকে খুব শ্রদ্ধা করতো সমর। তাই বাবার আদেশ মান্য করে শত বাধা অতিক্রম করে ভাইকে নিয়ে সে বাবার কাছে এসেছে। বাবা কত কষ্ট করেছেন তাদের মানুষ করতে। গোমো থেকে হাওড়া ছুটে বেড়িয়েছেন এক কালে। এখন বুড়ো হয়েছেন। বাবাকে তাই কোনো দুঃখ দিতে চায় না সমর।সমরের মেয়ে রিনি পিপুলকে ভালোবাসে।বাড়িতে সে মা বাবাকে বলে দিয়েছে পিপুলকে সে বিয়ে করবে।বাবা মায়ের একমাত্র কন্যা রিনি।খুব আদরে মানুষ হয়েছে।এখন সেই মেয়ে বিয়ে করতে চাইছে নিজের পছন্দের ছেলেকে।এতে তার বাবা মা রাজী হলো খুব আনন্দের সঙ্গে।

তারপর এক শুভ দিন দেখে রিনির বিয়ে হয়ে গেলো। তারপর দুবছর পরে তাদের সন্তান হোলো।বেশ চলছিলো সুখে দুখে।একদিন রিনি দেখলো পিপুল খুব তাড়াতাড়ি পাঁচজন লোকের সাথে ঘরে ঢুকলো।তারপর আবার বেরিয়ে গেলো।রিনির সন্দেহ হোলো।তার মনে হোলো কি এমন কাজ ছিলো তার যে তাকে কথা না বলেই পিপুল বেরিয়ে গেলো।এবার পাঁচবছর পরে তার মনে হোলো পিপুল বলে সে চাকরী করে প্রাইভেট ফার্মে। কিন্তু কি কাজ করে,কোথায় কাজ করে তার কোনো খবর সে রাখতো না। পিপুল চোরাচালানে যুক্ত। তাই সে লুকিয়ে রাখে নিজের কর্ম পরিচয়। কর্কট কালের স্পর্শে রিনির সংসার ভেসে গেলো।

এখন সে বাবার বাড়িতে থাকে আর পাড়ার মানুষদের দেখে সান্ত্বনা পায়। রিনি বলে,ভোরবেলা উঠেই জটাই মা এর মুখ দেখি।আশি বছর বয়সেও মুখে হাসি লেগেই আছে।তার প্রশ্নের উত্তর দেয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম সুপার মার্কেটে মর্নিং ওয়াকের জন্য।সেখানে আট থেকে আশি বছরের ভিড়।সবাই হাঁটছে। মুখে কোনো কথা নেই।শরীরচর্চার জন্য এসেছেন তারা।আমি এসেছি মনের খোরাক পাবো বলে।কালবৈশাখির তান্ডব নৃত্যের নিদর্শন পড়ে রয়েছে।ডালপালা ভেঙ্গে পড়ে আছে।নন্দনপাড়ার,ডেঙাপাড়ার সব লোকেরা ডালপালা কুড়োচ্ছে।জ্বালানির জোগাড় হয়ে গেলো ঝড়ের কৃপায়।একটা কালো কোকিল কুহু রবে মন মাতিয়ে দিচ্ছে।একটু ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছে।সূর্য পূব গগনে লাল আভা নিয়ে নিশি বিদায়ের সংগীত শুরু করেছে।মানুষের কাজের তৎপরতা শুরু হয়েছে।মাঠে কৃষকেরা সব্জী তুলে মাল গুদামে নিয়ে যাচ্ছে।টোটো নিয়ে টো টো করে ঘোরার আগে ধূপ দেখাচ্ছে সুজয়।আর একটু পরেই রোদে বৈশাখি নৃত্য শুরু হবে।তাই সকাল সকাল সকলের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়।জটাই এর মা কঠিন কর্কট রোগে আক্রান্ত। তবু সে নিয়মিত সব কাজ করে যায়। কোনো ঋণাত্মক ভাবনা তাকে কাবু করতে পারে নি।রিনি তো সব মেনে নিয়ে স্বামীর ঘরে থাকতে পারতো। কিন্তু এদের মত মেয়েদের কাছে কর্কট কালও পরাজিত। বিকৃত রুচি হার মানে।জটাই এর মা ভাবি প্রজন্মের কাছে রেখে যায় ইচ্ছাশক্তির জোর। যার কাছে কোনো কঠিন সমস্যা মাথা তুলে বিজয়ী হতে পারে না।রামু, অসীম, বাবুরাম,রিনি, বিরাজুল ও তার সঙ্গিসাথীরা কালের প্রবাহে এগিয়ে চলে অজানা এক গন্তব্যের দিকে,কর্কট কালকে উপেক্ষা করে।

পরিচিতি:

সুদীপ ঘোষাল নন্দনপাড়া খাজুরডিহি পূর্ব বর্ধমান ৭১৩১৫০
শেয়ার করুনঃ