Note: Now you can download articles as PDF format
বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য 9564866684 এই নাম্বারে যোগাযোগ করুন
  • Mysterious

নাদির শাহের গুপ্তধন (পর্ব ৩)

  • অনিমেষ দত্ত
  • Jan. 15, 2020
  • 629 বার পড়া হয়েছে

Sorry! PDF is not available for this article!


None

অষ্টাদশ শতক, মোগল আমল

(দিল্লী)

সূর্যোদয়ের অন্তরালে

গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের প্রবেশপথ দিল্লী।যমুনা নদীর তীর ঘেঁষে যাত্রা করিয়াছে এক একটি কাল।ইন্দ্রপ্রস্থের রাজা পৃথ্বিরাজ রাজ্যে এক বৃহৎ দুর্গ নির্মাণ করিয়াছিলেন তাহা 'দেহলি' থেকে 'দেহালিজ' নামে প্রচারিত হইতে থাকে।

উর্দু অপভ্রংশ হইতে হইতে তাহা পরবর্তীতে দিল্লী নামে পরিচিতি লাভ করিয়াছে।একসময় কোন এক শকাব্দে এল মামুদ গজনী।ভারতের ভাগ্যাকাশে সূর্যপথ নিঃশব্দে সাম্রাজ্য বিস্তার করল।মহম্মদ ঘোরী দিল্লী অধিকার করিলেন।সূর্য ক্রমশ আড়াল হইল।

অতঃপর ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবরের নেতৃত্বগুণে সর্বশেষ লোদি সুলতানের পরাজয় ঘটল ও ভারতে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হইল।

শতকের পর শতক শেষ হইল।১৭০৭ এল।ঔরঙ্গজেব চলিয়া যাইলেন।দাক্ষিনাত্য অঞ্চলে হিন্দু মারাঠা সাম্রাজ্য আধিপত্য বিস্তার লাভ করিতে শুরু করিল।

দিল্লীর শত্রু সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাইল।অষ্টাদশ শতকে তা ক্রমশ ডায়ন বিস্তারিত করিতে লাগিল।

রাত্রি অবসান হইতে কয়েক প্রহর বাকি।কৃষ্ণপক্ষের অন্তিম তিথি।অব্য আকাশ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ।সমস্ত দিল্লী নিঝুম তমসায় রুদ্ধ।'কিলা ই মুবারক' যাকে সবাই লালাকেল্লা বলে তার আলসের বিভিন্ন পার্শ্বে মশাল জ্বলিতেছে।

মোদগ্রস্ত আলোক দীপ্তি মৃদুমন্দ বাতাসে মিশে যাচ্ছে।সম্মুখের ধুমায়িত অগ্নিকুণ্ডের চারিপাশে একটি মক্ষিকা ভনভন শব্দে নিজের প্রাণ বিসর্জন দেবার জন্য মত্ত হয়ে উঠেছে।সমস্ত দিল্লীতে এ ভনভন শব্দ কর্ণগোচর হই নাই।

মশালের আলোয় দূর থেকে কেল্লাকে এক মস্ত পাথরের স্তুপ মনে হইতেছে।কেল্লা তখনও অসম্পূর্ণ।কেল্লার উত্তর-পূর্ব কোণে বৃহৎ প্রাচীন সালিমগড় দুর্গ।

কেল্লার ছাদে কিছু মোঘল চৌকিদার রাতের প্রহরায় নিযুক্ত।অন্তিম বসন্ত লগ্নে বাতাসের শীতল ভাব প্রহরীদের গভীর নিদ্রায় ক্রমশ তলিয়ে দিতেছে।এ অবস্থা দেখে যে কাহারো মনে হইতে পারে সমস্ত দিল্লী নিস্তব্ধ।কোথাও কোন শব্দ নেই।

লালকেল্লার দুইটি গেট।পশ্চিম দিকে লাহোরী গেট আর দক্ষিণ দিকে দিল্লী গেট।পশ্চিম দিককার লাহোর গেটে হঠাৎ ঘট্ ঘট্ করে শব্দ হইল।শব্দটা জোরালো নয়।কেল্লার দক্ষিণের লৌহ কপাট অল্প ফাঁক হইতেছে।দক্ষিণ দিককার দিল্লী গেটে পাহারারত সৈনিক সংখ্যা অল্প।লালকেল্লার পশ্চিম দিককার লাহোরী গেট অত্যন্ত সুরক্ষিত।পাহারারত সৈনিক অধিক।

ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একজন মোগল সৈনিক।পোশাক লৌহ বর্মে ঢাকা।সৈনিকদের পোশাক আড়াল করিয়াছে মোটা আলোয়ান।এক হাতে লৌহ বল্লম।

শীত অনেক আগে শেষ হইয়াছে।হিমেল হাওয়ায় হালকা কুয়াশার গুড়ো আস্তরণ দূরের সমস্ত কিছুই আড়াল করিয়াছে।

অন্ধকারের মধ্যে কেও মৃদু স্বরে হঠাৎ বলিল-

আর এগিও না।আমি এখানে আছি।

সম্মুখে কিছু দূরে যমুনা নদীর জলে পরিপূর্ণ পরিখা।

সৈনিকটি অন্ধকারে পূর্বে কাওকে না দেখিতে পাবার দরুণ খানিক অপ্রস্তুত হইয়া গেল।স্বর চিনিতে পারিয়া একটু হেসে বলিল -

আজকাল আমাকে ভয় দেখানো তোমার স্বভাব হয়ে গিয়েছে।

সৈনিক ঘুরে যেতেই দেখিতে পাইল বড় পাথরের সম্মুখে হেলান দিয়া এক স্ত্রীলোক দাঁড়াইয়া আছে।

অন্ধকারেও চিনিতে ভুল হইল না বেলাতুন কে।তাহার বয়স ছাব্বিশ কি সাতাশ হইবে।যদিও দেখিলে মনে হয় কুড়ি কি বাইশ।মেদহীন লম্বা শরীর।গায়ের রং উজ্জ্বল তামাটে।শুকনো গাছের পাতা দিয়া তামাটে রঙ প্রস্তুত করা হইয়াছে। বিচক্ষণ কেও স্পষ্টভাবে লক্ষ করিয়া দেখিলে স্বভাবতই মারাঠা বলিয়া সন্দেহ করিবে।অষ্টাদশ শতকে মোঘল রাজত্বে বিচক্ষণ ব্যক্তির বড়ই অভাব।

বেলাতুন দিল্লীর বাজারে তাহার মামার সহিত আতর বিক্রি করে।ছোট্ট একখান দোকান।দোকানের পশ্চাতে খানদুই ঘর।একটি বেলাতুন থাকে অন্যটিতে তাহার মামা সাহাবুদ্দিন।

মুঘল সম্রাট শাহজাহান আগ্রা থেকে দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তর কালে ছোট্ট একটি বাজারও দিল্লীতে নিয়ে যান।পরবর্তীতে তাহা ফুলিয়া ফাপিয়া বৃহৎ আকার ধারন করিয়াছে।

মোগল সৈনিকটির নাম অালি হোসেন।মোগল সমর্থ বুদ্ধিমান যুবক।বয়স বত্রিশ কিমবা তার বেশী।দীর্ঘ পেশীবহুল চেহারা।যুদ্ধ করিবার বয়স অনেক আগেই হইয়াছে।যদিও যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরী হই নাই। তলোয়ার,বল্লম,লাঠি চালানোর বিদ্যা তার জানা আছে।আলি হোসেন খোদাবন্দের খাস অঙ্গরক্ষক দলের অংশ।দিল্লীর গদিতে তখন দ্বিতীয় শাহজাহানের পুত্র মহম্মদ শাহ।তিনিই সকলের খোদাবন্দ।

আলি হোসেন,বেলাতুনের গা ঘেঁসিয়া দাঁড়াইল।দৃষ্টি কেল্লার দিকে।তারপর বলতে শুরু করল-

গোপন খবর আছে।তোমাকে সে জন্যই ডেকে পাঠালাম।মনে হয় খুব শিঘ্রই মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে মোগল সেনা।

বেলাতুন খুব চিন্তিত সুরে বলিয়া উঠিল-

তাহলে কি হবে?

শোনো পশ্চিমের অবস্থা খুব ভালো নয়।কোন এক নাদির শাহ সাত বছর আগে পারস্যের সিংহাসন আগেই দখল করেছে।এখন আফগানিস্থান -পাকিস্তান হয়ে দিল্লীর দিকে আসার চেষ্টা করছে।খোদাবন্দ এ নিয়েও চিন্তিত।

তাহলে মারাঠার দিকে নজর দেবেন না।আমার তো তাই মনে হয়।

তবুও তুমি সতর্ক থেক।

আচ্ছা আলি একটা কথা তোমায় জিগেস করব?

বল কি কথা!

যদি আমার আসল পরিচয় তুমি আগেই জানতে তাহলে কি আমায় কোতল করতে?

এসব কথা ভেব না।কোতল করবার ইচ্ছে থাকলে আগেই…

এখন এখান থেকে যাও।ভোর হয়ে আসছে।আর এই নাও কিছু বাজরার রুটি।তোমার জন্য খানসামার কাছ থেকে নিয়ে এসেছি।

বেলাতুন একটু হাসল।বাজরার রুটি গুলো হাতে নিয়ে বলল তাহলে এবার আসি।

আলি, বেলাতুনের হাত হঠাৎ ধরে বলল -

সাবধানে যেও।দুদিন পর বিকেলে দোকানে দেখা হবে।

রাতের অন্ধকারে দুই তরতাজা প্রান কুয়াশার মোড়কে মিশে যাইতে লাগিল।লৌহ কপাট বন্ধ হল।কেও কিছু জানিতে পারল না।

প্রত্যুষের আলো বাদশাহের কক্ষে তখনও প্রবেশ করে নাই।বাদশাহ শয্যা ত্যাগ করে কক্ষের সাম্মুখের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন।

তক্ততাউস এ বসিয়া রওশন আখতার নাম বদলে হয়েছেন আবুল ফতে নাসিরুদ্দিন মহম্মদ শাহ গাজী।সকলের মহম্মদ গাজী।

বাদশাহ পূর্বের তুলনায় আজ বেশ চিন্তিত।তিনি জানেন মোগলরা চেঙ্গিস খাঁন ও তৈমুর লঙের বংশধর।তবুও মুঘল সম্পত্তি ও গুপ্তশত্রুর হাত হইতে সাম্রাজ্যকে রক্ষা করিতে পারিবেন কিনা তা যথেষ্ট সন্দেহের।সম্মুখের আলসের দিকে ক্রমশ এগিয়ে গেলেন বাদশাহ।পূবের আকাশ সবে মাত্র ফরসা হইয়াছে।মোগল বাগ হইতে ময়ূরের ডাক শোনা যাইতেছে।চমক ভাঙিল।

সূর্যের অপেক্ষা না করিয়া কক্ষে প্রবেশ করিলেন।কিছু পরে এক পেয়ালা সিরাজি হাতে নিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।

সম্রাজ্ঞী মালিকা আল জুমানি কক্ষের বিছানায় তখনও গভীর নিদ্রায় মগ্ন।

বেলা বাড়িতে লাগিল।মোগল বাগ ক্রমে আলোকিত হইতে লাগিল।লালকেল্লার বিভিন্ন পার্শ্বে নিত্যদিনের কাজ শুরু হইয়াছে।কোলাহল মুখর কেল্লার চারিপার্স্বস্থ এলাকা।

সকাল সকাল দরবার বসিয়াছে।মোগল অভিবাদন জানিয়ে দরবার শুরু হইয়াছে।সবাই নিজস্ব আসন পরিত্যাগ করে বাদশাহকে সন্মান জানালেন।ময়ূর সিংহাসনে গম্ভীর ভাবে উপবিষ্ট হলেন মহম্মদ শাহ।

তারপর গভীর চিন্তায় মগ্ন হলেন।কিছু সময় অতিবাহিত হবার পর বললেন-

উমর দউরান, পশ্চিমের সীমান্ত মজবুত কর।এক শত সেনা পাঠাও।কেল্লার রাতের পাহারা যেন দস্তুর থাকে।

মোঘল বাহিনীর ঝানু সেনাপতি আমির-উল-উমর সামসামুদ-দৌল্লা খান দউরান বলল-

জো হুকুম।

এক আমির বলল

জাঁহাপনা, এ বছর ফসল উৎপাদন ভালো হয়েছে তাই আদায় বেশ ভালো হয়েছে।

মহম্মদ শাহ বললেন

তা বেশ।রাজকোশ পূর্ণ কর।

বাদশাহ তারপর দরবার ভঙ্গ করলেন।মহম্মদ শাহ এরকমই।কখন কি করে বসেন তাহার ঠিক নেই।খেয়াল খুশি সম্পদের ব্যবহার তেমন না করলেও নিজের ঠাট বাট আজও বজায় রেখেছেন।

এইভাবে দ্বিতীয় দিবস কাটিয়া গেল।মোগল সেনা তার শক্তি বৃদ্ধি করিয়া চলেছে।গোপনে গুপ্তচর নিয়োগ বাড়িয়ে দিয়েছেন খোদাবন্দ।

আলি হোসেন দিল্লীর বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

বেলাতুনের আতরের দোকানের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।তারপর চারিদিকে দৃষ্টি দিয়ে বলল

তুমি কেমন আছো?

বেলাতুন হেসে বলল

ভালো।

বেলাতুন সর্ব সময় মুখে হাসি নিয়ে থাকে।ছোট্ট দোকান আতরের গন্ধে মম করিতেছে।দোকানে আর কেও নেই।

এটা তোমার দোকান?

কোন সন্দেহ নেই এটা আমার দোকান।

তারপর দুইজনে খুব হাসল।হঠাৎ হোসেন গম্ভীর হয়ে বলল-

বেশিক্ষণ সময় নেই খুব তাড়াতাড়ি কেল্লায় ফিরে যেতে হবে।কেউ কিছু জানার আগেই।সাবধানে থেকো।

মারাঠা শাসক সাহু শিবাজীর মতো সুযোগ্য না হলেও দিল্লির ওপর সর্বসময় নজর রাখেন।

নিজের প্রধান দুই গুপ্তচরকে দিল্লীতে রাখিয়াছেন।তিনি এটা জানেন দিল্লী যেকোনো সময় আক্রমণ করা যাইতে পারে কিন্তু তিনি শিবাজীর মতো শক্তিশালী নন।বর্তমানে মারাঠা শক্তি নিয়ে সেভাবে দিল্লী আক্রমণ করা সম্ভব নয়।মারাঠা জাতিকে রক্ষা করার জন্য দিল্লীর ওপর গোপনে নজরদারি প্রয়োজন।তাছাড়া দিল্লী ছাড়াও ভারতের সীমান্তে বহিরুৎপাত ঘটতে পারে।সাবধান থাকতেই এই ব্যবস্থা।

সুতরাং সাহু দিল্লীতে দুজন গুপ্তচরকে পাঠান।যারা পালাবদল করিয়া সমস্ত সংবাদ সাহুর কাছে পাঠাতে থাকে।

পরিচিতি:

জন্ম ১৪ জানুয়ারী, ১৯৯৫।বেড়ে ওঠা পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার আনন্দপুরে।
প্রথমে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক শিক্ষণ সংস্থায় শিক্ষা লাভ।পরবর্তী কালে উচ্চ শিক্ষার জন্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে স্নাতক।
বর্তমানে মেদিনীপুর কলেজ থেকে স্নাতকোত্তরে পাঠরত।
স্কুলের দেওয়াল ম্যাগাজিনে গুচ্ছ কবিতা দিয়ে সাহিত্য জীবন শুরু।প্রথম গল্প প্রকাশ পায় ২০১৭ সালে।এরপর থেকে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও ওয়েবে গল্প,কবিতা প্রকাশ পেয়ে চলেছে।
যেমন -কালি কলম ও ইজেল,পান্ডুলিপি,এবং সায়ক,প্রাঙ্গণ,শব্দসাঁকো,মুকুর,৯নং সাহিত্য পাড়া লেন,শহরতলীর ডায়েরী প্রভৃতি।
নাদির শাহের গুপ্তধন লেখকের প্রথম উপন্যাস।

শেয়ার করুনঃ